বুধবার, ৮ জুন, ২০১১

কংগ্রেসম্যানের দোষ স্বীকার


অ্যান্টনি ওয়েইনার

ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্তত ছয়জন নারীবন্ধুর কাছে তিনি তাঁর অর্ধনগ্ন ছবি পাঠিয়েছেন। এসব নারীর সঙ্গে তাঁর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে। গত সোমবার নিউইয়র্কে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবে নিজের সব দোষ স্বীকার করেন মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা অ্যান্টনি ওয়েইনার।
নিউইয়র্ক থেকে ছয়বার নির্বাচিত হয়েছেন ওয়েইনার। কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ায় এখন তিনি তোপের মুখে। নিজের লজ্জাকর কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও ওয়েইনার পদত্যাগ করবেন না বলে জানিয়েছেন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা অ্যান্টনি ওয়েইনারকে নিউইয়র্ক নগরের ‘ভবিষ্যৎ মেয়র’ বলে মনে করা হতো। নির্বাচনী এলাকায় তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হুমা আবেদিনকে।
গত সপ্তাহে ইন্টারনেটে প্রথম ওয়েইনারের একটি অর্ধনগ্ন ছবি প্রকাশিত হয়। টুইটারের মাধ্যমে নারীবন্ধুকে নিজের অশালীন ছবি পাঠানোর বিষয়টি প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন। প্রথমে সাংবাদিকদের ওয়েইনার বলেন, তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ করা হয়েছে। অন্য কেউ এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তাঁর ছবি ছেড়েছে। নিজে থেকে বিষয়টি তদন্ত করার ঘোষণা দেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এক সপ্তাহ ধরে এই সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। গত সোমবার সকাল থেকে রক্ষণশীল ওয়েবসাইট ‘বিগ গভর্নরমেন্ট ডট কম’-এ ওয়েইনারের নতুন নতুন অর্ধনগ্ন ছবি প্রকাশ হতে থাকে। একপর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে প্রভাবশালী এই কংগ্রেসম্যানের সব রক্ষাব্যূহে যেন ধস নামে। নিজের কৃতকর্মের জন্য সংবাদ সম্মেলন ডেকে সবার সামনে তিনি অঝোরে কাঁদতে থাকেন। নিজের স্ত্রী, সহকর্মীসহ সংবাদমাধ্যমকে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার জন্য তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেন। তবে অশ্লীল ছবিবিনিময়ে সরকারি কম্পিউটার বা কার্যালয় ব্যবহার করেননি বলে পদত্যাগ করবেন না বলে ওয়েইনার ঘোষণা দেন।

সংসদে আসুন যা করার নিজেরা করি, অন্যদের কেন সুযোগ দেব


শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্তের চেষ্টা না করে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সংসদে আসুন, যা করার আমরা এখানে নিজেরা বসে করি। অন্যদের এ সুযোগ কেন দেব?’ তিনি বলেন, অনির্বাচিত ব্যক্তিরা ক্ষমতায় এসে আর যেন রাজনীতিবিদের হেয় প্রতিপন্ন করতে না পারে, সে জন্য বিরোধী দলের সংসদে যোগ দিয়ে সংবিধান সংশোধনে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
জাতীয় সংসদে আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বতন্ত্র সাংসদ মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
ফজলুল আজিম তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, তা দূর করার কোনো উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী নেবেন কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কীসের আশায় বিরোধী দলীয় নেতা রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চান, জানি না।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রাজনীতিবিদদের ওপর নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটা সুবিধার জন্য আমরা সকলে মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু করেছিলাম। কিন্তু সেই পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে তারা ক্ষমতায় এসে রাজনীতিবিদদের চোর বানাবে, আমাদের দুর্নীতিবাজ বানাবে, সে সুযোগ কেন তাদের দেব? আসুন, আমরা যা করার নিজেরা বসে করি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে কাজের কাজ তো কিছু করতে পারেননি।’
বিরোধীদলীয় নেতাকে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওনার (খালেদা জিয়া) দুই ছেলেকে মেরে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। উনি আর আমি জেল খেটেছি। রাজনীতিবিদদের চোর বানানো হয়েছে। উচ্চমার্গের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে রাজনীতিবিদ মানেই খারাপ। এখন উনি কোন আশায়, কোন ইশারায় রাজনীতি উত্তপ্ত করতে চাচ্ছেন, তা উনিই জানেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেনাপ্রধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান সবই তো সেদিন নিজের পছন্দমতো ঠিক করে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু লাভ তো হয়নি। জেলের ভাত তো তাঁরও খেতে হয়েছে। সেই জেল খাটার কথা, মার খাওয়ার কথা তিনি ভুলে গিয়ে সেই দরজা কেন আবার তিনি খুলে দিতে চান?’
আবদুল মান্নানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতার বুধবারের ‘বাজেট ভাবনা’র সমালোচনা করে সংসদ নেতা বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর বাজেট ভাবনা সংসদে এসে বললে অর্থমন্ত্রী তা থেকে কিছু গ্রহণ করতে পারতেন। আসলে ওনার (খালেদা জিয়া) সংসদ থেকে হোটেলই হয় তো বেশি ভালো লাগে।’

রবিবার, ৫ জুন, ২০১১

তত্ত্বাবধায়ক বাতিল হলে টানা আন্দোলন


সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন খালেদা জিয়া সমকাল

মহাজোট সরকারকে পদত্যাগ করে অবিলম্বে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল রাখার দাবিতে টানা কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, সরকারের পদত্যাগের পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। একইভাবে গঠন করতে হবে একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। সে সরকার ও কমিশনের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তারাই দলীয়করণকৃত প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বিতর্কিত এ রায়ের ছুতা ধরে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার কোনো সুযোগই নেই। কোনো সুযোগই যদি না থাকে তাহলে বিরোধী দলের মতামত দিয়ে লাভ কী পাল্টা প্রশ্ন রাখেন তিনি।
গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলে সরকারের অবস্থানের বিপরীতে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে সংসদে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিকল্প ফর্মুলা থাকলে তা উত্থাপন করার আহ্বান জানান। এর আগে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই। জবাবে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলে দেশে গভীর সংকটের আশঙ্কা ব্যক্ত করে খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি কোনো
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নেবে না। ব্যর্থ সরকার পদত্যাগ করে মধ্যবর্তী নির্বাচন না দিলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের অপচেষ্টা থেকে বিরত না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আগামীতে তারা আরও কঠোর ও টানা আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে জানান তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সরকার আড়াই বছরে কোনো ক্ষেত্রেই সামান্যতম সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং ব্যর্থতার পর্বতের নিচে চাপা পড়ে এখন তারা মিথ্যাচার, অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো বুঝতে পারছেন, দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তার ফল কী দাঁড়াবে। মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ যে এখন ক্রোধে পরিণত হচ্ছে সে কথাও তার না বোঝার কথা নয়। এ শোচনীয় পরাজয় এড়াতে প্রধানমন্ত্রী এখন নিজে ক্ষমতায় থেকে সংসদ নির্বাচন করার পাঁয়তারা করছেন। তারা এও জানেন যে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার স্বপ্ন পূরণ না হলে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) চাইবেন তার অনুগত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে। আর তিনি নির্ভর করবেন তথাকথিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ওপর।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা বাতিল করার ব্যাপারে দেশের জনগণের কাছ থেকে কোনো অনুমোদন এ সরকার নেয়নি। কাজেই আদালতের রায় কিংবা অন্য কোনো অজুহাতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজন দেশবাসী মানবে না, তারাও মেনে নেবেন না।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আরএ গনি, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল হক মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এমএ কাইয়ুম, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি ইতিমধ্যেই ব্যর্থ সরকারের পদত্যাগ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা করেছে। তারা মনে করেন, এ সরকার যত বেশি দিন ক্ষমতায় থাকবে দেশ ও জাতির তত বেশি ক্ষতি হতে থাকবে। তাই সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি করেছেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে এবং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় বিএনপি রোববার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। এ হরতাল কোনো ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়। এ হরতাল জাতীয় স্বার্থে। এ হরতাল জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার জন্য।
রোববারের হরতাল সফল করতে সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারের তরফ থেকে জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি ও আটক করা হচ্ছে। আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং হয়রানি ও গ্রেফতার বন্ধের দাবি জানান তিনি। হরতাল চলাকালে কোনো ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
খালেদা জিয়া বলেন, এ হরতাল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংকট, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি রোধ এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শেয়ারবাজার রক্ষায় ব্যর্থ সরকারের পদত্যাগের মাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার কথা আওয়ামী লীগ বলছে আপিল বিভাগের একটি রায়ের ধুয়া তুলে। এ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার_ সংবিধান সংশোধনের সম্পূর্ণ এখতিয়ার জনগণের নির্বাচিত সংসদের, কোনো আদালতের নয়। কাজেই সংবিধান সংশোধনের জন্য কোনো আদালতের কোনো রায়ের বাস্তবায়ন পার্লামেন্টের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, অতীতে উচ্চ আদালতকে বিভক্ত করার বিরুদ্ধে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের দেওয়া রায় ছিল আইনজীবী সমাজ, আন্দোলনকারী সব রাজনৈতিক দল ও সমাজশক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই সে রায়টির বাস্তবায়ন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই হয়েছিল। এবারকার ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। সংবিধান সম্পর্কে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের দেওয়া আলোচ্য রায়টি সর্বসম্মত নয়। বিচারপতিরাই এ রায়ের ব্যাপারে একমত হতে পারেননি।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আলোচ্য রায়টি জনগণের ব্যাপক অংশের দ্বারা তুমুল সমালোচিত হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এ রায় মেনে নিতে পারেননি। বিতর্কিত এ রায়টি আইন ও সংবিধানসম্মত নয়। পরস্পরবিরোধী, দুর্বল, যুক্তিহীন ও বিতর্কিত। যে সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এ রায় দেওয়া হয়েছে তিনি ইতিমধ্যে নানা প্রশ্নবোধক কর্মকা ের জন্য বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী সম্মানিত নাগরিক প্রফেসর ড. ইউনূস, এমন কি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি নিজে তার কাছ থেকে কোনো ন্যায়বিচার পাননি।
খালেদা জিয়া বলেন, মুন সিনেমা হলের মালিকানা সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে এ বিচারপতি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। চরম বিভ্রান্তিকর এ রায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতিফলন ঘটেছে। প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বিএনপি সম্পর্কে চরম বিরূপ মনোভাব। আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরাগ ও বিএনপির প্রতি বিরাগের বশবর্তী হয়ে যে তিনি এ রায় দিয়েছেন তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। অর্থাৎ তিনি কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নন। এ বিতর্কিত বিচারপতিকে পদোন্নতি দিতে আওয়ামী লীগ সরকারকে আপিল বিভাগের সদস্য সংখ্যা সাত থেকে বাড়িয়ে এগারো জন করতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, দু'জন যোগ্য ও দক্ষ বিচারপতিকে ডিঙ্গিয়ে তাকে বর্তমান সরকার প্রধান বিচারপতি করেছিল। কাজেই, জনগণের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, সরকারের জন্য সুবিধাজনক ও মনমতো রায় পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সরকারের অনুগ্রহভাজন এ ধরনের বিচারপতির রায়ের ছুতা ধরেই আজ সংবিধান বদল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা চলছে। এ বিতর্কিত রায়ের একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আরও দুই মেয়াদ বহাল রাখা যাবে বলে যে মত দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার এখন সেটিও এড়িয়ে যেতে চাইছে।
ডিজিটাল কারচুপির ষড়যন্ত্র চলছে অভিযোগ করে বিরোধী নেতা বলেন, সংবিধান সংশোধনের নামে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তুলে দেওয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিটি সচেতন মানুষ ইতিমধ্যেই সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দেওয়াই নয়, তথাকথিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের নামে প্রধানমন্ত্রী মেকানিক্যাল বা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে জনগণের ভোটের রায় পালটে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এবং তাদের ভোট নিয়ে জাল-জালিয়াতির অপচেষ্টা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রতিহত করব ইনশাহ্আল্লাহ।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দেশবাসী পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনকেও প্রহসনে পরিণত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সব দল নিষিদ্ধ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় স্বৈরশাসন প্রবর্তন করেছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের সরকার বেছে নেওয়ার যে অধিকার জনগণের ছিল, তা কেড়ে নিয়েছিল। নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সব পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। আজ আবার তারা সেই একই পথ অবলম্বন করছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আজ আবার শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সব পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে তার পরিণাম ও পরিণতি সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করা হচ্ছে। তিনি আশা করেন, সময় থাকতে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।
সরকার দেশকে আবারও এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা এ সংকট চাননি বলেই চরম বিতর্কিত নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে প্রথম দিনেই তারা সংসদে যোগ দেন। সরকারকে তারা ভালো কাজে সহযোগিতার কথা বলেন। গত প্রায় আড়াই বছরে প্রমাণ হয়ে গেছে, এ সরকার কেবল অযোগ্য ও ব্যর্থই নয়, তারা চরম হঠকারীও বটে।
তিনি বলেন, দশ টাকা কেজি দরে চাল, ঘরে ঘরে চাকরি, ফ্রি সারসহ জনগণকে দেওয়া চটকদার ওয়াদাগুলোর একটাও তারা পূরণ করেনি। জনগণের কল্যাণের কোনো চিন্তা তাদের নেই। তারা ব্যস্ত দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের কাজে। জাতীয় স্বার্থ তারা রক্ষা করতে পারেনি। বিদেশি প্রভুদের কাছে দেওয়া গোপন অঙ্গীকার তারা পূরণ করে চলেছে একের পর এক। এ সরকারের লোকেরা এবং তাদের আত্মীয়স্বজন লুটপাট করে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে। তাদের দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের কথা কেউ বললেই জেল-জুলুম, হামলা-মামলায় তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন হীনপন্থায় তারা হরণ করেছে সংবাদ-মাধ্যমের স্বাধীনতা।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সাল থেকে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে কী ভয়ঙ্কর নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল। সেই আওয়ামী লীগ এখন বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো প্রয়োজন নেই।
প্রশ্নোত্তর
ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দায়ী_ প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ওয়ান-ইলেভেন ছিল দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রের ফসল। এর পেছনে আওয়ামী লীগ জড়িত ছিল। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই দেশের ওই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমস্যা সমাধানে সরকারি দলের সঙ্গে বিএনপি আলোচনায় বসবে কি-না জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। সংবিধানের বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রাখলে সব সমস্যার সমাধান হবে।
দুই নেত্রী উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় না থেকে তত্ত্বাবধায়ক সম্পর্কে অবস্থান নিয়েছেন_ ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের এ বক্তব্য সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান খালেদা জিয়া। এ সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বর্তমানে যে মেয়াদ রয়েছে তারা সে মেয়াদেই রাখার পক্ষে। বড় দুই দল পরস্পরকে ছাড় দেওয়া সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখানে ছাড় দেওয়া বা না দেওয়ার কিছু নেই। দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতেই এ হরতাল আহ্বান করা হয়েছে।
সংসদে যোগ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, সংসদে কথা বলার সুযোগ নেই। তাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে তারা দলীয় অবস্থান তুলে ধরছেন।
দেড় ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলন শুরু : প্রথমে খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল ৫টায়। পরে বলা হলো, বিকেল সাড়ে ৫টায় শুরু হবে। তাও হয়নি। অবশেষে শুরু হলো সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে। অবশ্য ৬টা ২৪ মিনিটে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েই দেরির জন্য সাংবাদিকদের কাছে 'দুঃখ প্রকাশ' করলেন খালেদা জিয়া। বললেন, শ্রমিক দলের কাউন্সিল থেকে আসতে তার দেরি হয়ে গেছে।
শ্রমিক দলের কাউন্সিলে খালেদা : বিকেলে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে শ্রমিক দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ সময় খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। বিকল্প কোনো পদ্ধতি মেনে নেবেন না তারা। তার দাবি, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষায় হরতাল দেওয়া হয়েছে।
'আগামীকালের (রোববার) হরতাল দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার' বলে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনারা এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে অনেক হরতাল দিয়েছেন, জানমালের ক্ষতি করেছেন। সেসব তো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। তা না পারলে তত্ত্বাবধায়কের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে।'
দীর্ঘ আট বছর পর শ্রমিক দলের এই ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ৬৮টি সাংগঠনিক জেলার কাউন্সিলররা অংশ নিয়েছেন। ৬ জুন সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে শ্রমিক দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে নজরুল ইসলাম খান সভাপতি ও জাফরুল হাসান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, এম মোরশেদ খান, রাজিয়া ফয়েজ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, আবদুল হালিম, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি প্রমুখ।
খালেদা জিয়া বলেন, দেশে এখন গণতন্ত্রের নামে চরম স্বৈরতন্ত্র চলছে। কথায় কথায় আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সব কাজ করা হচ্ছে। আসলে সরকারের নির্দেশ পালন করছেন আদালত।  

পাকিস্তানে হুজি নেতা ইলিয়াস কাশ্মীরি নিহত



পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন (চালকবিহীন যুদ্ধবিমান) হামলায় আল কায়দার সহযোগী সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) শীর্ষ নেতা ইলিয়াস কাশ্মীরিসহ নয়জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের ঘাওয়াখওয়া এলাকায় ওই হামলা চালানো হয়। হুজি ইলিয়াস কাশ্মীরির নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। খবর দ্য
টাইমস অব ইন্ডিয়া, এএফপি ও ডন অনলাইনের।
বিবিসির উর্দু সার্ভিস গতকাল প্রথমে ইলিয়াস কাশ্মীরির নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে। পরে পাকিস্তানের ডন নিউজ ও অন্যান্য টেলিভিশনের সংবাদে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইলিয়াস কাশ্মীরির অবস্থান লক্ষ্য করে শুক্রবার মার্কিন ড্রোন থেকে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর দুটি ইলিয়াসের দলের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এতে ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে হুজি কমান্ডার ইলিয়াস কাশ্মীরিও আছেন। পাকিস্তানের বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, এক বিবৃতিতে ইলিয়াস কাশ্মীরি নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন হুজির মুখপাত্র আবু হানজালা। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইলিয়াসের রক্তের বদলা নেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত ৯ জঙ্গির শরীর পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। চেনার উপায় নেই কোনটা কার লাশ। অন্য এক সূত্র দাবি করেছে, নিহতরা পাঞ্জাবি তালেবান। তবে, হামলাস্থলের আশপাশের কয়েকজন জানিয়েছেন, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর নেতা ইলিয়াস কাশ্মীরি মারা গেছেন। স্থানীয়দের মতে, ১০ দিন আগে ইলিয়াস কাশ্মীরি খাইবারগিরি এলাকা থেকে ওয়াজিরিস্তানের ওয়ানায় আসেন। ওই এলাকায় তালোন জঙ্গিদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে।
ইলিয়াস কাশ্মীরি যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার সন্ধানদাতাকে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল অনেক আগেই। যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মিত্রদের দাবি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের সমন্বয়কারী ছিলেন এ জঙ্গি নেতা। গত ২২ মে করাচির নৌঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনাকারীও ছিলেন ইলিয়াস। ভারতের মুম্বাইয়ে ২০০৮ সালের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা এবং পাকিস্তানে বড় বড় জঙ্গি হামলার রণকৌশল ইলিয়াস কাশ্মীরির মাথা থেকেই বেরিয়েছে বলে অনেকের ধারণা।

দুই দিনের কর্মসূচি দিল বিএনপি

হরতাল-পরবর্তী দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কাল সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং পরের দিন দেশের সব জেলা শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে দলটি।
আজ রোববার হরতাল চলাকালে দমন নিপীড়ন, দলের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন ও আটকের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
আজ নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হরতাল-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আরও বলেন, ‘হরতাল প্রমাণ করেছে, দেশের জনগণ আর এই সরকারকে দেখতে চায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার দাবিতে আজকের এই হরতাল সফল করে জনগণ আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।’

আজ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল


রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গতকাল যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাংলামোটর এলাকা থেকে তোলা
ছবি প্রথম আলো

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ডাকে আজ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলে সংসদের বিশেষ কমিটির প্রস্তাব ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। চারদলীয় জোটের অন্য শরিক দলসহ সমমনা আরও কয়েকটি ছোট দল হরতালে সমর্থন জানিয়েছে।
এদিকে হরতালের আগের দিন গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১১টি যাত্রীবাহী বাস ও একটি ট্যাক্সিক্যাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ এসব অগ্নিসংযোগের দায়িত্ব স্বীকার করেনি।
গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, হরতাল চলাকালে রাজধানীতে সব ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করবে পুলিশ। কেউ শান্তি বিনষ্ট করার মতো কিছু করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, সংবাদপত্রবাহী গাড়ি, খাবার ও ওষুধের দোকান, হাসপাতালসহ যেসব এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে, সেসব এলাকা হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
হরতালের সমর্থনে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি ও জামায়াত। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ও মিরপুরে বিএনপির হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর হরতালের সময় সব সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহন বন্ধ রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি গত রাতে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সরকারি দলের ক্যাডাররা বিএনপির নেতা-কর্মীদের নানা রকম ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
বিএনপির অভিযোগ, গত প্রায় আড়াই বছরে সরকারের ব্যর্থতার কারণে কারচুপি ছাড়া নির্বাচনে আর জয়লাভ করা সম্ভব নয়, এটা তারা বুঝে গেছে। এ কারণেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ষড়যন্ত্র করছে।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে দেশবাসীকে হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হরতালের সমর্থনে ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামী কাকরাইল মোড় থেকে মিছিল বের করে, মৌচাক মোড়ে গিয়ে তা শেষ হয়।
সমমনা দলের সমর্থন: গতকাল সকালে নয়াপল্টনে সমমনা ছোট ১২টি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে দেখা করে হরতাল কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তাঁরা হরতালে মাঠে থাকারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
দলগুলোর মধ্যে আছে: ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, যুব-ন্যাপ বাংলাদেশ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, লেবার পার্টি, ন্যাপ-ভাসানী ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন শরিক দলগুলো পৃথকভাবে হরতাল কর্মসূচির প্রতি নিজেদের সমর্থন জানিয়েছে। তবে তারা যুগপৎভাবে হরতাল পালন করবে। আপাতত জোটগতভাবে কোনো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শরিক দলের নেতারা।
পুলিশের অবস্থান: হরতাল চলাকালে রাজধানীতে যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডের নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ হুঁশিয়ারি জানান। এ সময় মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, কেউ কেউ হরতালের আগের রাতে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, ভয়ভীতি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটায়। এসব ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য পুলিশ গতকাল দুপুর থেকে সব ধরনের কার্যক্রম শুরু করেছে। হরতালের আগে ও হরতাল চলাকালে কেউ নাগরিক-নিরাপত্তা ব্যাহত ও শান্তি বিনষ্ট করার মতো কাজ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
হরতালের দিন বাস চলাচলের বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, সড়কে কেউ বাস না চালালে সেটা ওই বাসের মালিক ও চালকের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে বাস চলাচল করলে পুলিশ সার্বিক নিরাপত্তা দেবে।
গাড়িতে অগ্নিসংযোগ: রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গতকাল ১১টি যাত্রীবাহী বাস ও একটি ট্যাক্সিক্যাবে আগুন ধরানোর ঘটনা ঘটেছে। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় একই সময় আজিমপুর, বাংলামোটর এবং ফকিরাপুলে তিনটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাত আটটার দিকে মহাখালী, কাঁটাবন, কাপ্তানবাজার ও কমলাপুর এলাকায় চারটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাত নয়টার দিকে জুরাইনে ও মোহাম্মদপুর আসাদগেট এলাকায় দুটি বাস এবং খিলক্ষেত এলাকায় একটি ট্যাক্সিক্যাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর দেড় ঘণ্টা পর মগবাজার রেলক্রসিং এলাকায় একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

অপরাজেয় সুন্দরবন


সুন্দরবনের ৬২ শতাংশ এলাকায় বনজ সম্পদ বেড়েছে

প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার ক্ষত সারিয়ে তুলতে উপকূলবাসী এখনো হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু দুটি ভয়ংকর ঝড়ের ধাক্কা সামলে অপরাজেয় সুন্দরবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এই বনের সম্পদ নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ১৩ বছরে সুন্দরবনের ৬২ শতাংশ এলাকায় গাছের সংখ্যা, গাছের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেড়েছে। বনে চারা গজানোর পরিমাণও আগের তুলনায় ভালো।
তবে সমীক্ষা অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৩২ শতাংশ এলাকায় বনজ সম্পদের পরিমাণ কমেছে। মূলত পাশে মানববসতি আছে এমন এলাকায় বনজ সম্পদের পরিমাণ কমেছে। আর বনের যে অংশে নদী ও বঙ্গোপসাগর, সেই অংশে বনজ সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে।
সুন্দরবনের গাছের সংখ্যা ও কার্বন শুষে নেওয়ার সক্ষমতা জানতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বনসেবা বিভাগের কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশ বন বিভাগ পাঁচ মাস ধরে এই সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ১৩ বছরে সুন্দরবনের গাছ, লতা-গুল্ম ও বনজ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর ও নদীতীরবর্তী অংশে গাছের সংখ্যা ৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনা জেলার সুন্দরবন অংশে গাছের পরিমাণ ৩ শতাংশ কমেছে।
এক যুগ ধরে সুন্দরীগাছের আগা-মরা রোগ নিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এ বিষয়ে স্বস্তিদায়ক তথ্য দিয়েছে সমীক্ষাটি। এতে দেখা গেছে, মাত্র ৩ শতাংশ সুন্দরীগাছে আগা-মরা সমস্যা প্রকট। বাকি এলাকায় সুন্দরীগাছ ভালোভাবেই বেড়ে উঠছে।
সহকারী বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ ও যুক্তরাষ্ট্রের বনসেবা বিভাগের প্রতিবেশ গবেষক ড্যানিয়েল সি ডোনাটোর নেতৃত্বে কার্বনের পরিমাণ নির্ধারণ সমীক্ষা: ২০০৯-১০ পরিচালিত হয়। এই সমীক্ষার কার্বন-সংশ্লিষ্ট অংশটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তথ্য আকারে প্রকাশ করা হয়।
সমীক্ষা অনুযায়ী, সুন্দরবনের লোকালয়সংশ্লিষ্ট এলাকায় বনজ সম্পদ কমছে। এসব এলাকার বনজ সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধির জন্য করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, বিশেষ করে সিডর-আইলার পর সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপের কারণে বনের উল্লেখযোগ্য অংশে সম্পদ বেড়েছে। লোকালয়সংশ্লিষ্ট যেসব এলাকায় সমস্যা আছে সেখানে, নির্দিষ্ট করে বললে বনসংলগ্ন ৯৭ গ্রামের মানুষকে নিয়ে বন বিভাগ সহব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালু করছে। ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় তা চালুও হয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন-সহযোগীদের সহায়তায় বনের পাশে বসবাসকারী মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, এতে এসব এলাকায় বনজ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
অপরাজেয় সুন্দরবনের শক্তি: সমীক্ষায় বলা হয়, ২০০৭ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার কারণে সুন্দরবনের নদী ও সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় বেশি ক্ষতি হয়েছিল। বসতি এলাকায় আসতে আসতে ঝড় দুটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
সিডর ও আইলার পর আবহাওয়া বিভাগ সিডরের গতিপথ ব্যাখ্যা করে বলেছিল, সুন্দরবন না থাকলে সিডরের ধাক্কা লাগত খোদ রাজধানী পর্যন্ত। সুন্দরবনের গাছপালায় বাধা পেয়ে সিডরের গতি প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার থেকে কমে ২০০ কিলোমিটারের নিচে নেমে গিয়েছিল। নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে সুন্দরবন রক্ষা করেছিল মানুষের জীবন ও সম্পদ।
প্রকৃতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ঘূর্ণিঝড় আইলার পর একটি তাৎক্ষণিক সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছিল, সুন্দরবনের কারণে আইলার বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা চার ফুট কমে গিয়েছিল।
সিডর ও আইলার পর সুন্দরবন নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। বন বিভাগের হিসাবে, সিডরে সুন্দরবনের ২৫ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, বনের প্রতিবেশব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনেকে বলেছিলেন, সুন্দরবন এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে না। উপড়ে পড়া গাছের সারি আর ঝলসে যাওয়া গোলপাতা দেখে অনেকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এর মধ্যে নতুন করে গাছ লাগাতে হবে। পড়ে যাওয়া গাছ কেটে ফেলতে হবে। গাছকাটার দরপত্র আহ্বানের জন্যও ছোটাছুটি শুরু করে একটি পক্ষ। ওই সময় বিদেশের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, ‘সুন্দরবনকে বিরক্ত করবেন না’। ২০০৭ সালের ১ ডিসেম্বর বন বিভাগ ভেঙে যাওয়া গাছ না কাটার সিদ্ধান্ত নেয় এবং গোলপাতা ও মধু আহরণ নিয়ন্ত্রণ করে। আরেকটি বর্ষা যেতে না-যেতেই সুন্দরবন এই সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা প্রমাণ করে। সবুজ-সতেজ সুন্দরবন জানিয়ে দিয়েছিল, সে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
ঝড়ের পরের সম্ভাবনা: বন বিভাগের এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ১৩ বছরে সুন্দরবনে চারা গজানো এবং তা থেকে পরিপূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। ২০০৯ সালে ৫৩ হাজার ৮০৬ হেক্টর জমিতে নতুন চারা গজিয়েছে। ’৯৬ সালে নতুন চারা গজিয়েছিল ৩৪ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমিতে; বিশেষ করে, সুন্দরবনের সবচেয়ে শক্তিশালী বৃক্ষ সুন্দরী, গেওয়া, বাইনগাছের পরিমাণ বেড়েছে আগের তুলনায়।
দুটি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আর গাছচোরদের উৎপাতের পরও সুন্দরবনের বনজ সম্পদের পরিমাণ কেন বাড়ল, এই প্রশ্নের জবাবে সমীক্ষার তত্ত্বাবধায়ক ইমরান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সিডর ও আইলার আঘাতে সুন্দরবনে অনেক পুরোনো ও বড় গাছ ভেঙে পড়েছিল। এতে ছোট ও নতুন গাছের বেড়ে ওঠার মতো আলো-বাতাস ও জীবনীশক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভাঙা গাছ না কাটার ফলে পড়ে থাকা গাছের ডাল-পাতা পচে বনের মাটিকে উর্বর করেছে। এতে টিকে থাকা গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠেছে। চারা গাছ পরিণত হওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক আতিক রহমান এ ব্যাপারে বলেন, ‘সুন্দরবনকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিয়ে একে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবন থেকে সম্পদ আহরণের চিন্তা বাদ দিতে হবে। একে সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় থেকে আমাদের রক্ষা করবে।’ প্রকৃতি ও বন থেকে মানুষ এভাবেই সেবা নিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।


সুন্দরবনের যত সম্পদ
১৯৯৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের এক লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর এলাকাকে বন্য প্রাণীর জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পূর্ব সুন্দরবনের নীলকমল, পশ্চিমের নোটাবেটী ও দক্ষিণের নীলকমলের এই এলাকায় সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৭ সালে সিডরের পর সরকার আবারও সুন্দরবনে গোলপাতা ও মধু ছাড়া সব ধরনের সম্পদ আহরণ বন্ধ করে দেয়।
বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে ৩১৫ প্রজাতির পাখির বাস। এর মধ্যে ৮০ প্রজাতি অতিথি পাখি। রয়েছে ৪০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। আছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। এখানে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গোলপাতা, পশুর, কাঁকড়া, হেতাল, বলা, সিংড়া ও খলসীগাছ বেশি জন্মে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিখ্যাত হলেও এ বনে ৩৭৫ প্রজাতির বেশি বন্য প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৯১ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা। লোনা পানির কুমির, বন্য শূকর, বানর, ডলফিন, মেছো ও বনবিড়াল ও বিখ্যাত চিত্রল হরিণ হামেশাই দেখা যায় সুন্দরবনে। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জরিপ অনুযায়ী, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ৪৪০টি।