শনিবার, ২৮ মে, ২০১১

খালেদা জিয়ার সঙ্গে ক্রাউলির সাক্ষাৎ


যুক্তরাষ্ট্র সফররত বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ার জোসেফ ক্রাউলি। সাক্ষাত্কালে ক্রাউলি বলেন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে না পারলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর অনিশ্চিত।
গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড অব এস্টোরিয়া হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট শমসের মবিন চৌধুরী এবং চেয়ারপারসনের প্রেস সেক্রেটারি মারুফ কামাল। খালেদা জিয়া উপস্থিত সংবাদকর্মী ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেও কোনো বক্তব্য দেননি।
সংবাদ সম্মেলনে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি এখন জনতার দাবি হয়ে উঠেছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে সবগুলো সভায়ই বিএনপির পক্ষ থেকে এ দাবির যথার্থতা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে সুশাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সফররত খালেদা জিয়ার কথা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
শমসের মবিন চৌধুরী বাংলাদেশে কোনো সংবিধান কার্যকর আছে কি না তা জানতে চান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। জঙ্গিবাদ ও বাংলাদেশকে নিয়ে যারা বহির্বিশ্বে প্রচার চালায়, তারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।
লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে স্থানীয় সময় শনিবার ভোরে খালেদা জিয়া নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন। দুবাইতে তিনি যাত্রাবিরতি করবেন। আগামী সোমবার তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।

সিরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৮

সিরিয়ায় গতকাল শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আটজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স দেশটির মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানায়, দেশজুড়ে সরকারবিরোধীদের ওপর প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দমন অভিযানের প্রতিবাদে গতকাল ওই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হোমস শহরে তিনজন, রাজধানীর কাতানা শহরতলিতে তিনজন, লেবানন সীমান্তবর্তী জাবাদানি শহরে একজন এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইবলিব প্রদেশে একজন নিহত হয়েছে।
একটি মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলীয় দের আল-জোর শহরেও গতকাল নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আসাদের শাসন অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে সিরিয়ায় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সরকারবিরোধীরা বিক্ষোভ করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত কমপক্ষে এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। 
এদিকে ফ্রান্সে জি-৮-ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা বলেছেন, সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞে তারা ‘মর্মাহত’। বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ তাত্ক্ষণিক অবসানের দাবিও জানিয়েছেন জি-৮ নেতারা।

শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১১

প্যারিসে কথা হলো হাসিনা-হিলারির


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইউনেসকো সদর দপ্তরে 'গার্লস অ্যান্ড ওমেনস এডুকেশন ফর এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি' শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেসকো সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে তাঁর সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক এজেন্ডা এবং সর্বাধিক কল্যাণলাভের জন্য সব মানবীয় কর্মকাণ্ডে পুরুষের সমপর্যায়ে আসা তাদের জন্য অপরিহার্য। 
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবে এবং ইউনেসকো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভাও বক্তব্য দেন।
প্যানেল আলোচনা সভায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবের নাম উল্লেখ করে বলেন, 'আপনারা শিক্ষাকে কোনো অধিকার নয়, বাস্তব রূপ দিয়েছেন।'
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, 'কেবল নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুসংহত করার পাশাপাশি সবার জন্য একটি নিরাপদ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ এক বিশ্ব গড়তে পারি।' জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রবর্তনের মাধ্যমে জেন্ডার ইস্যুতে নবযুগের সূচনা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে জেন্ডার ইস্যু ও নারীর ক্ষমতায়ন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ সহস্রাব্দ অ্যাওয়ার্ড-২০১০ প্রান্তিক শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের জন্য বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি, নারী মুক্তির জন্য শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম প্রধান বিষয়। এ জন্য আমাদের পূর্ববর্তী (১৯৯৬-২০০১) ও বর্তমান এই উভয় সরকারের আমলে আমরা নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি।'
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রযাত্রা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৫টি সংরক্ষিত আসন ও সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৯ জনসহ মোট ৬৪ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা মোট আসনের ১৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও কৃষি, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন নারী। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, হুইপ, স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সদস্য পদেও রয়েছেন নারী।
তিনি জানান, ১৯৯৯ সালের আইনে সব সিটি করপোরেশনে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষণের বিধান করা হয়। ২০০৯ সালে স্থানীয় সরকারের দ্বিতীয় স্তরে দুটি ভাইস চেয়ারম্যান পদের মধ্যে একটি নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। এ পদে ৪৭৫ জন নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
জনপ্রশাসনে নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমার প্রথম সরকারের মেয়াদে প্রথমবারের মতো আমরা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে মহিলা বিচারপতি নিয়োগ দিই এবং বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি পদেও মহিলা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।' তাঁর সরকারের আমলে প্রথম মহিলা সচিব, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইত্যাদি নিয়োগের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে নারীরা বেসামরিক, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহী হয়েছে।
শেখ হাসিনা আরো বলেন, সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা, আইনি ও পুলিশি সহায়তাসহ ছয়টি বিভাগে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু রয়েছে।
ইউনেসকো মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ : জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা গতকাল বিকেলে ইউনেসকো সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় তাঁরা নারী ও শিশু শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকের শুরুতে ইউনেসকো মহাপরিচালক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নে শেখ হাসিনার সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার জন্য তাঁর প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্যারিসে ইউনেসকো সদর দপ্তরে বাংলাদেশের ভাষাশহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার গড়ে তোলার উদ্যোগের জন্য ইউনেসকোর প্রশংসা করেন।
সংবর্ধনায় যোগদান : প্যারিসে বুধবার রাতে শেখ হাসিনা তাঁর সম্মানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অপরাধীরা অবশ্যই শাস্তি পাবে ইনশাল্লাহ। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিচার প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। 
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি অনীল দাশগুপ্ত, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান মো. শরীফ, ফ্রান্স আওয়ামী লীগের নেত্রী জাহানারা সুলতানা, নার্গিস সুলতানা, শিউলি আখতার ও প্রখ্যাত মূকাভিনেতা পার্থপ্রতীম মজুমদার।

ওয়েস্টমিনস্টার হলে ভাষণে ওবামা বিশ্বকে এখন নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা



যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নেতৃত্বে এখন বিশ্ব চলবে। গত বুধবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার হলে সে দেশের পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। ওবামা জানান, বিশ্ব অধিকারকে তুলে ধরার দায়িত্ব এখনও পাশ্চাত্যের শক্তির হাতে। সেটা জি-২০-এর মতো বহুজাতিক ফোরামের মাধ্যমেই করতে হবে। খবর বিবিসি ও আল-জাজিরা অনলাইনের।
যুক্তরাজ্য সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা ওয়েস্টমিনস্টার হলে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে এ ধরনের ভাষণ এই প্রথম। সেখানে তখন বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর, টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনসহ যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন। ওবামার ৩৫ মিনিট ধরে চলা বক্তৃতার সময় হলজুড়ে ছিল নীরবতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো শক্তির উত্থান ঘটলেও বিশ্বের ওপর পাশ্চাত্যের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। বিশ্বকে তারাই নেতৃত্ব দেবে। তিনি চীন ও ভারতের মতো শক্তির উত্থানকে আমেরিকান ও ইউরোপীয় প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এবং তার গণতান্ত্রিক মিত্রদের নেতৃত্বের প্রয়োজন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলা করতে। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিশ্বমন্দা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য আবার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেঁৗছেছে। তিনি ইরাক অভিযানে বিজয়, আফগানিস্তানে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি এবং ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মাধ্যমে আল কায়দাকে চরম আঘাত দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, উভয় দেশ ইতিহাসের অংশীদার হিসেবে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এবং আমাদের গণতান্ত্রিক মিত্ররা বিশ্বকে এমন এক রূপ দেবে, সেখানে নতুন জাতির উত্থান এবং মানুষের সমৃদ্ধি ঘটবে।' ওবামা বলেন, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিশ্ব নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে তারা অপরিহার্য লক্ষ্য হিসেবে বর্তমান শতাব্দীকে আরও শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধিশালী ও ন্যায়পরায়ণ করে তুলবে।'


পাকিস্তান জঙ্গি নির্মূলে সব পদক্ষেপ নেবে: গিলানি


ইউসুফ রাজা গিলানি
পাকিস্তান দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি নির্মূলে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। গত বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি এ কথা বলেন। নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর তালেবান জঙ্গিদের সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার ঘটনায় দেশটির সরকার এখন কঠোর সমালোচনার মুখে। এ পরিস্থিতিতে সরকার জঙ্গি নির্মূলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জানানো হয়নি।
নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য গত বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষা কমিটির এক বৈঠক ডাকেন। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য, সেনা, নৌ, বিমান ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। একই দিন পেশোয়ারে একটি শক্তিশালী ট্রাকবোমা হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ছয় সদস্যসহ নয়জন নিহত হয়। এতে একটি থানার ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা মোকাবিলায় সামর্থ্যের বিষয়টি যে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা স্বীকার করেন গিলানি। তবে ওই বৈঠকের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কৌশল ব্যক্ত করা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি নির্মূলে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে।
আফগান সীমান্তসংলগ্ন এলাকার দিকে ইঙ্গিত করে বিবৃতিতে বলা হয়, যথাযথ সব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারের সব আইন প্রয়োগকারী শাখা এটি নিশ্চিত করবে যে, ওই এলাকায় সন্ত্রাসীদের সব আস্তানা ধ্বংস হয়েছে।
পাকিস্তান থেকে সেনা হ্রাসের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে তাদের সেনা হ্রাসের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন সেনা হ্রাসে ইসলামাবাদের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়। গত বুধবার মার্কিন সামরিক বাহিনী এ কথা জানিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল ডেভ ল্যাপান বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছি, পাকিস্তানে মার্কিন সেনাসংখ্যা কমিয়ে আনতে দেশটির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা সেনা হ্রাসের পরিকল্পনা করছি।’
পেন্টাগন জানায়, দুই সপ্তাহ আগে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে, তাদের মার্কিন বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষকদের দরকার নেই। এ ছাড়া তাঁরা পাকিস্তানে থাকলে সহায়তার পরিবর্তে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ প্রশিক্ষকেরা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাকিস্তানে কতজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা আছেন, সেটা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী জানায়নি। তবে ল্যাপান বলেছেন, এ সংখ্যা ২০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার তিন দিন পর মার্কিন সেনা হ্রাসের অনুরোধ করার ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২ মে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে অ্যাবোটাবাদের একটি বাড়িতে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর একচেটিয়া অভিযানে নিহত হন বিন লাদেন। রয়টার্স, এএফপি।

বাড়তি ভাড়া আদায়, মিরপুরে যাত্রী-শ্রমিক হাতাহাতি


বাড়তি বাস ভাড়া আদায়ের দায়ে গতকাল ভ্রাম্যমান আদালত বিভিন্ন বাস কোম্পানিকে জরিমান করেন।
সরকার-নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় অব্যাহত রেখেছেন রাজধানীর বাসমালিকেরা। 
গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুরে বাড়তি ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে বাসশ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। এর জের ধরে সকালে ওই এলাকায় কিছুক্ষণ বাস চলাচল বন্ধ ছিল। রাজধানীর অন্য কয়েকটি স্থানেও বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাসশ্রমিকদের বিবাদ হয়েছে। 
ইউনাইটেড পরিবহনে আগারগাঁও তালতলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ১৩ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এই পরিবহনের মিনিবাসগুলো পল্লবী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যায়। শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর ১০ নম্বর থেকে উঠে ফার্মগেট এলেও যাত্রীদের পল্লবীর টিকিট কাটতে হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী তালতলা থেকে ফার্মগেটের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। সরকার মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ঠিক করেছে পাঁচ টাকা। এই পথের দূরত্ব সর্বনিম্ন ভাড়ার মধ্যেই পড়ে।
সর্বনিম্ন ভাড়া দিয়ে একজন যাত্রী মিনিবাসে ৩ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার যেতে পারবে। বড় বাসে যেতে পারবে সাড়ে চার কিলোমিটার। 
তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য পাঁচ টাকা। বিআরটিসির বাসে পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া এক টাকা ৫৫ পয়সা।
মিরপুরে হাতাহাতি: সকাল আটটার দিকে পরিবহনশ্রমিকেরা মিরপুর পল্লবী থেকে যাত্রাবাড়ী রুটের বেশির ভাগ বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। শিকড় পরিবহন, সিল্কসিটিসহ বেশির ভাগ পরিবহন কোম্পানির শ্রমিকেরা রাস্থায় নেমে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এতে যাত্রীরা বিড়ম্বনায় পড়ে। যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও পুলিশের অবস্থানের কারণে ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে জটলা তৈরি হয়।
শতাধিক শ্রমিক ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নিলে ওই স্থানে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। শ্রমিকদের কিছু অংশ ট্রাফিক পুলিশের সামনেই স্লোগান দিয়ে অন্যান্য বাস চলাচলে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন, যাত্রীরা তাঁদের মারধর করেছে। ট্রাফিক পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে শিকড়, সিল্কসিটিসহ বেশ কটি পরিবহন কোম্পানির মালিকপক্ষের লোকেরা ঘটনাস্থলে আসেন। যাত্রীদের কয়েকজন বাসমালিকদের সামনে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার তালিকায় মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ভাড়া ২৫ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ২৮ টাকা। এ ছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া পাঁচ টাকা হলেও নেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা।
শিকড় পরিবহনের শ্রমিক মোখলেস পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, প্রতিটি বাসে শ্রমিক থাকেন দুই থেকে তিনজন। যাত্রী থাকে ৪০ থেকে ৫০ জন। বাসভাড়া বাড়ানোর পর থেকে বেশির ভাগ যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া দিতে চাইছে না। এ নিয়ে যাত্রীরা একজোট হয়ে পরিবহন শ্রমিকদের মারধর করছে। গতকাল সকালে এ রকম কয়েকটি বাসে শ্রমিকদের মারধর করায় তাঁরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন। 
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রীদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডার ঘটনায় কিছুক্ষণ বাস চলাচল বন্ধ ছিল। তবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কিছুক্ষণের মধ্যে পুনরায় বাস চলাচল শুরু হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত: গতকাল রাজধানীতে বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় রোধে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ৮১টি বাসের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এসব মামলায় জরিমানা আদায় হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। পাঁচটি বাস জব্দ করা হয়।
শাহবাগ, গাবতলী, মিরপুর, তেজগাঁওসহ ছয়টি স্থানে এসব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। ছয়টি আদালতের মধ্যে বিআরটিএর দুটি এবং ঢাকা জেলা প্রশাসন পরিচালনা করে চারটি।

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০১১

মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ: মুহিত

‘২১ মে ভোর পাঁচটা। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়া থেকে আমি মাত্র ১০০ মিটার দূরে। চোখের সামনে দেখলাম, অক্সিজেন শেষ হয়ে একজন আইরিশ আরোহী মারা গেলেন। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। মনে আবার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে লাগলাম। চূড়ায় উঠে যখন বাংলাদেশের পতাকাটা ওড়ালাম, মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।’
গতকাল রাতে প্রথম আলোকে টেলিফোনে কথাগুলো বলছিলেন দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট বিজয়ী মোহাম্মদ আবদুল মুহিত (৪১)। ২১ মে সকাল সাড়ে সাতটায় তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি এভারেস্ট থেকে নেমে আসেন। বিকেলে এসে পৌঁছান নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। হাতে এভারেস্ট-জয়ের সনদ।
৮ এপ্রিল এভারেস্ট-জয়ের লক্ষ্যে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন মুহিত। ১৯ এপ্রিল তিনি নেপাল থেকে তিব্বতের উদ্দেশে রওনা হন। ২২ এপ্রিল বেস ক্যাম্পে পৌঁছান। ২৯ এপ্রিল অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে। এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেক বাংলাদেশি সজল। অসুস্থ হয়ে পড়ায় সজল আর এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার অভিযানে যেতে পারেননি। চূড়ান্ত অভিযানে মুহিতের দলে তিনিসহ সদস্য ছিলেন সাতজন। এর মধ্যে পাঁচজন শেরপা।
মূল অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহিত বলেন, ‘১৮ মে সকাল ১০টায় অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প থেকে রওনা দিয়ে বেলা সাড়ে তিনটায় আমি ক্যাম্প-১-এ পৌঁছাই। এটি সাত হাজার মিটার উঁচুতে। ১৯ মে সকাল সাড়ে আটটায় রওনা দিয়ে বিকেল চারটায় ক্যাম্প-২-এ পৌঁছাই। এটি সাত হাজার ৭০০ মিটার উঁচুতে। তখন সেখানে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল। আমি সেখানেই থেকে যাই। ২০ তারিখ ভোরে ঘুম থেকে উঠি। ভোর পাঁচটায় উঠে ক্যাম্প-৩-এর উদ্দেশে রওনা দিই। ক্যাম্প-৩-এ পৌঁছাই বেলা তিনটায়। এটি আট হাজার ৩০০ মিটার উঁচুতে। ক্যাম্প-৩-এ তাঁবু খাটিয়ে আমরা সাতজন গাদাগাদি করে বিশ্রাম নিলাম। ২০ তারিখ রাত নয়টায় আমরা এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য সর্বশেষ অভিযান শুরু করি। টানা ১০ ঘণ্টা উঠতে থাকি। ২১ মে সকাল সাতটায় আমি এভারেস্টের চূড়ায় উঠি।’
চূড়ায় ওঠার পর কেমন লাগল, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘চূড়ায় ওঠার পরপরই আমার অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়। আমার শেরপা অক্সিজেনের বোতল বদলে দেন। আমি আধা ঘণ্টা চূড়ায় ছিলাম। অর্থাৎ সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত।’
এ সময় সেখানে কী করলেন? মুহিত বলে চলেন, ‘পৃথিবীর সব সৌন্দর্য তখন দুই চোখ ভরে দেখেছি। ছবি তুলেছি। মাকালু আর চয়ি চূড়ার ছবি তুললাম। আকাশ পরিষ্কার ছিল। তবে বাতাস ছিল বেশ।’
নামার বর্ণনা: মুহিত বলেন, এভারেস্টে ওঠার সময় যতটা শক্তি থাকে, নামার সময় ততটা থাকে না। সাড়ে সাতটার দিকে নামতে শুরু করলাম। এভারেস্টের তিব্বতের অংশে পাথর দিয়ে হাঁটা কঠিন। নামার পথে আমি পাঁঁচটা মৃতদেহ দেখেছি। রাতের বেলায় এই ভয়ংকর পথ দিয়ে হেঁটেছিলাম। সরু পথ। সতর্কতার সঙ্গে আস্তে আস্তে নামছিলাম। শরীর ভেঙে আসছিল। ২১ তারিখ বেলা তিনটায় আমি ক্যাম্প-৩-এ এসে পৌঁছাই। শরীর তখন ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে চা-পানি-কফি খেলাম।’ 
মুহিত বলেন, ‘কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ক্যাম্প-২-এর উদ্দেশে নামতে শুরু করলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ক্যাম্প-২-এ এসে পৌঁছালাম। ভেবেছিলাম, ক্যাম্প-১-এ টানা নেমে যাব। আমার সঙ্গে থাকা তিনজন নেমেও গেছে। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না। শেরপাকে বললাম, আমি আর আজ ক্যাম্প-১-এ যেতে পারব না। রাতে শেরপাসহ আমরা চারজন ক্যাম্প-২-এ থাকলাম। সকালে শুরু করতে দেরি হচ্ছিল। কারণ প্রচণ্ড বাতাস। সকাল ১০টার দিকে নামতে শুরু করলাম। দুপুর ১২টায় ক্যাম্প-১-এ পৌঁছালাম। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করলাম। দুপুর আড়াইটার দিকে রওনা করে বিকেল সাড়ে চারটায় এসে পৌঁছালাম অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে (এবিসি)। সেখানে বাকি তিনজন আমাকে অভ্যর্থনা জানাল।’
‘চার দিন পর এবিসিতে এসে আমি ভাত খেলাম মুরগির মাংস দিয়ে। এরপর স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে ইনাম ভাইকে (ইনাম আল হক) ফোন করলাম। এক মিনিট কথা হলো। এরপর আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বললাম।’ মুহিতের বর্ণনা।
মুহিত বলেন, ‘২৩ তারিখ পর্যন্ত এবিসিতে থাকলাম। ২৪ তারিখ ভোরে রওনা দিই। বিকেল চারটায় আমি বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। সেখানে ভাত খাই। ২৪ তারিখ বিকেলে আমাকে এভারেস্ট-জয়ের সার্টিফিকেট (সনদ) দেওয়া হয়। এটি অন্য এক অনুভূতি।’ 
ওই দিনই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিংরিতে নেমে আসেন মুহিত। রাত শেষে ২৫ তারিখ (গতকাল) ভোরে আবার রওনা দেন। বেলা ১১টার দিকে জাংমু সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পৌনে ১২টার দিকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল চারটায় কাঠমান্ডু এসে পৌঁছান।
মুহিত বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সিমি গুরুং (৫০) নামে একজন নেপালি অভিযাত্রী ছিলেন। সিমির বাড়ি নেপালের মানাং জেলায়। এই জেলার কেউ প্রথম এভারেস্টে চড়লেন। তাঁকে সবাই অভ্যর্থনা জানালেন। জানালেন আমাদেরও। এখান থেকে গেলাম নেপাল ব্যাংকে। সেখানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সন্ধ্যায় হোটেলে উঠলাম।’
বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং ট্র্যাকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সদস্য মুহিত জানান, তিন-চার দিন পর তিনি ঢাকায় আসবেন।
বিএমটিসির সভাপতি ইনাম আল হক গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৩ সালে চূড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা ক্লাব শুরু করেছিলাম। সেই লক্ষ্য পূরণ হলো। কাজেই কতটুকু ভালো লাগছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।’
মুহিতের বাবা মনোয়ার হোসেন। মা আনোয়ারা বেগম। মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার উচ্চরক্তচাপ। এত টেনশন নিতে পারছিলাম না। যত দিন পর্যন্ত ওর খোঁজ পাচ্ছিলাম না, খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন আমার শান্তি লাগছে।’
মুহিতেরা চার বোন, তিন ভাই। মুহিতের পিঠাপিঠি ছোট বোন সাংবাদিক রাবেয়া বেবী। কেমন লাগছে জানতে চাইলে বলেন, ‘ও (মুহিত) ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত। হঠাৎ করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। অনেক স্মৃতি ওর সঙ্গে আমার। খুব ভালো লাগছে।’
গত বছরের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন মুসা ইব্রাহীম। মুহিত দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে গত ২১ মে এভারেস্ট জয় করলেন

বসনিয়ার গণহত্যার অপরাধী ম্লাদিচ গ্রেপ্তার

বসনিয়ার পলাতক যুদ্ধাপরাধী রাদকো ম্লাদিচ গ্রেপ্তার হয়েছেন। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস টাডিক এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। বসনিয়ায় ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিৎসা গণহত্যার সময় সাবেক এই সেনাপ্রধানের হাতে প্রায় আট হাজার মুসলমান গণহত্যার স্বীকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিবিসি এ খবর জানায়।
২০০৮ সালে রাদোভান কারাদিচ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের মূল ভূমিকা পালনকারী ম্লাভিচকে গ্রেপ্তার করা হলো। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে কারাদজিকের বিচার চলছে। ম্লাদিচকেও হেগের আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হবে। 
জেনারেল ম্লাদিচ বসনিয়ার তৎকালীন সামরিক জান্তার মধ্যে অন্যতম। তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে।
ন্যাটোর প্রধান অ্যান্দেস ফগ রাসমুসেন ম্লাদিচকে গ্রেপ্তারের প্রশংসা করে বলেছেন, এর ফলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

খালেদা জিয়া সপরিবারে দুর্নীতি করেছেন: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ক্ষমতায় থাকার সময় একা নয় সপরিবারে দুর্নীতি করে কালো টাকার পাহাড় বানিয়েছেন। বাড়তি জরিমানা দিয়ে তাঁরা আবার সেই কালো টাকা সাদা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, কালো টাকা তো কালোই। সেটা আর সাদা হয় না।
প্যারিসের একটি হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। 
আজ একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নয়, খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবার আখের গুছাতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গত দুই বছর ধরে কাজ করছে। এর ফলে দেশের ভাবমূর্তি বিদেশে উজ্জ্বল হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর দুর্নীতির দেশ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় দেশ । 
প্রসঙ্গত, এর আগে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও নারী উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখায় শেখ হাসিনা প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন।

ফলে রাসায়নিকদ্রব্য মেশানো বন্ধে হাইকোর্টের ৬ নির্দেশনা


ফলে রাসায়নিকদ্রব্য মেশানো বন্ধে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। 
জনস্বার্থে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশনা দেন। আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
ছয় নির্দেশনা: বিভিন্ন ফলের আড়ত ও বাজারে রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল বিক্রি ঠেকাতে বিএসটিআইকে তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসায়নিকযুক্ত ফল বিক্রি করা হলে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ফলে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো বন্ধে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে একটি সুপারিশমালা তৈরি করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে খাদ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এর অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল বিক্রি বন্ধে ফলের বাজার তদারকিতে একটি পরিদর্শক দল গঠন করতে খাদ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসায়নিক পদার্থযুক্ত ফল আমদানি বন্ধে দেশের এমন পয়েন্টগুলোতে তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। 
এ অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে বলা হয়েছে। এর অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
রাজশাহীর আমবাগান থেকে আম বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে আমবাগানগুলোতে প্রহরা ও তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রাজশাহীর ডিআইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার, ২৫ মে, ২০১১

পদ্মা সেতু নির্মাণে আইডিবির সঙ্গে চুক্তি সই

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণ চুক্তি সই করেছে সরকার। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে এক হাজার ২২ কোটি টাকা (১৪ কোটি ডলার) ঋণ দেবে আইডিবি।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সফররত আইডিবির প্রেসিডেন্ট আহমেদ মোহামেদ আলী নিজ নিজ পক্ষে চুক্তিতে সই করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব এম মোশারফ হোসাইন ভুঁইয়া, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইঞাসহ আইডিবির কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষর শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন বয়ে আনবে পদ্মা সেতু। সেতুটি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতেও ভূমিকা রাখবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রী হিসেবে আমার এ চুক্তিতে সই করার কথা নয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও তা করেছি। আইন মন্ত্রণালয় এতে সংকীর্ণতামুক্ত থাকবে বলেই আশা করছি।’
আইডিবির প্রেসিডেন্ট আহমেদ মোহামেদ আলী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি এ সেতুর নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত ব্যয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।’ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আইডিবির সহায়তার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মসিউর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও উন্নয়ন সহযোগীদের একত্রে কাজ করার একটি চমৎকার উদাহরণ তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে সেতু নির্মাণের কাজ তদারক করার আশ্বাস দেন উপদেষ্টা।
যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, মূল সেতু, নদী শাসন ও সংযোগ সড়কের দরপত্র শিগগির আহ্বান করা হবে। সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক থেকে আরও ৩০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ঋণ পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
আইডিবির এই ঋণের বিপরীতে সুদ হিসেবে বাংলাদেশকে ছয় কোটি ডলার গুনতে হবে, তবে তা পরিশোধ করতে হবে ৩০ বছরে।
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রাক্কলিত নির্মাণ-ব্যয় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ ২১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। আইডিবির আগে গত ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আট হাজার ৭৬০ কোটি টাকার (১২০ কোটি ডলার) চুক্তি সই হয়েছে। ১৮ মে জাপানের সঙ্গে হয়েছে দুই হাজার ৯২০ কোটি টাকার (৪০ কোটি ডলার) ঋণ চুক্তি। আগামী ৬ জুন এডিবির সঙ্গে চার হাজার ৪৮৯ কোটি টাকার (৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার) ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
আইডিবির সঙ্গে ‘ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’তে অর্থায়নের জন্য অপর একটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় গতকাল। ১২০ কোটি টাকার (এক কোটি ৭১ লাখ ডলার) এ প্রকল্পে আইডিবি সহায়তা দেবে ১০৮ কোটি টাকা (এক কোটি ৪৮ লাখ ডলার)। ১২ কোটি টাকা ব্যয় করবে সরকার। এ চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন অর্থমন্ত্রী ও আইডিবির প্রেসিডেন্ট।

সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেনি এসইসি ও দুদক

পুঁজিবাজার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্যই। কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। এ কারণে বাজারও স্থিতিশীল হতে পারছে না। ফলে নিজ দলের সদস্যদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে।
বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি)। কিন্তু তারা প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি। পুনর্গঠনই হয়নি এসইসি। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) কেবল হাতে পেয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনটি। আর কোনো অগ্রগতি নেই। আর বাজেট প্রণয়ন নিয়ে মহা ব্যস্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিছু ব্যক্তির ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়ে রেখেছে।
বাজারের সাম্প্রতিক ধসের জন্য তদন্ত কমিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির ব্যর্থতাকেই দায়ী করে এর পুনর্গঠনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দৈনন্দিন কাজের বাইরে বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কমিশন।
পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটির যেসব সুপারিশ সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে এসইসি আনুষ্ঠানিক কোনো দিকনির্দেশনাও পায়নি। গত ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তদন্ত প্রতিবেদনের ২৫টি ও মন্ত্রণালয়ের ১১টিসহ মোট ৩৬টি সুপারিশ তিন দফায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে ১১টি অবিলম্বে, ১৭টি স্বল্প মেয়াদে এবং সাতটি মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, এসইসি পুনর্গঠনের পর স্বল্প মেয়াদ বলতে এক মাস আর মধ্য মেয়াদ বলতে চার মাস সময়কে বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস (২৫ দিন) হতে চললেও সরকার গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি। এসব সুপারিশের বড় অংশই বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসইসির ওপরই বর্তাবে। কিন্তু পুনর্গঠনের কাজ অসম্পন্ন থেকে যাওয়ায় এ ব্যাপারে তেমন কিছুই করতে পারছে না সংস্থাটি।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির সদস্য হেলাল উদ্দিন নিজামী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলেই পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। আর এটা হলেই সরকার যেসব সুপারিশ গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারব।’
হেলাল উদ্দিন বলেন, এসইসি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন না হলেও দৈনন্দিন কাজ থেমে নেই। বাজার নজরদারি ও তদারকি সঠিকভাবেই চলছে। এ ছাড়া বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজের সমন্বয় ঘটানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। 
মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ আপনাদের কাছে এসেছে কি না জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, ‘এটা তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই রয়েছে। তা ছাড়া মন্ত্রণালয়ে রিকুইজিশন দিয়েও সংগ্রহ করেছি।’
এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, ১৬ মে সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ১৭ মে দুদকের চেয়ারম্যান দাপ্তরিক কাজে বিদেশে যাওয়ায় এ বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি এখনো বিদেশে রয়েছেন। ২৯ মে থেকে তিনি নিয়মিত অফিস করবেন। এ প্রসঙ্গে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনার মো. বদিউজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে চাননি।
উল্লেখ্য, গত সোমবার অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘শেয়ারবাজারের দুর্নীতি সম্পর্কে কিছুদিন আগে আমরা প্রতিবেদন পেয়েছি, সে অনুযায়ী অপরাধ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশনে এবং কিছু পুলিশ বিভাগে নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে এসইসি পুনর্গঠনের পর কিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেয়ারবাজারের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে দুদককে তদন্ত করতে দেওয়া হয়েছে।’
এসইসির অসম্পন্ন পুনর্গঠন: এসইসি পুনর্গঠনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে শেয়ারবাজার। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আসছে না নতুন কোনো শেয়ার। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ সুযোগে একশ্রেণীর বিনিয়োগকারী বাজারে নানা নেতিবাচক গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চির ধরাচ্ছেন। ফলে প্রায় প্রতিদিনই লেনদেন কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে শেয়ারের দর। এ অব্যাহত দরপতনে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা মাঝেমধ্যেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। পুঁজি হারানোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। 
পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের জন্য এসইসিতে একজন চেয়ারম্যান ও ন্যূনতম দুজন সদস্য প্রয়োজন। আর সরকার এবার চারজন সদস্য নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজনের নাম শোনা গেলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী দেশে না ফেরা পর্যন্ত নতুন কোনো সদস্য নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 
গুজব ও অনিশ্চয়তার বাজার: শেয়ারবাজার এখন পরিণত হয়েছে গুজবের বাজারে। আসন্ন বাজেটে শেয়ারবাজারের ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হচ্ছে, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব খোলার জন্য করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক হচ্ছে—এসব গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঢালাওভাবে সব ধরনের বিনিয়োগকারীর ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখবে এ ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিনে দরপতনের এগুলোই ছিল প্রধান কারণ। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রচারের পর এসব গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি টিআইএন বা মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হবে এমন কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া একই দিন এনবিআরও বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শেয়ারবাজারের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছুই তারা করবে না বলে জানিয়েছে। এনবিআরের এ প্রচারণায় কাজ না হলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে। 
গতকাল মঙ্গলবার টানা চার দিনের দরপতনের ধারা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে এসেছে শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৬৮ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৪৪। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৮০ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ২১১। সূচক বাড়ার পাশাপাশি উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের পরিমাণও সামান্য বেড়েছে। কিন্তু এ দর বৃদ্ধিও স্বস্তি ফেরাতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। তাই সকালে যখন দাম একটু বেশি বাড়তে দেখা গেছে তখন অনেকেই শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। এ কারণে দিনের শুরুতে যে গতিতে বাজার বাড়ছিল, দিন শেষে সেই গতি দেখা যায়নি।
পুঁজি হারিয়ে অসুস্থ: পুঁজি হারানোর ধকল সামলাতে না পেরে গত সোমবার লেনদেন চলাকালে নূরুজ্জামান (৫২) নামের এক বিনিয়োগকারী হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি রাজধানীর দিলকুশায় ফিনিক্স সিকিউরিটিজে লেনদেন করছিলেন। ব্রোকারেজ সূত্রে জানা যায়, আগের দিনগুলোর মতো ওই দিনও দরপতন অব্যাহত থাকলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বুকে ব্যথা অনুভবের কথা বললে তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 
সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস সূত্রে জানা গেছে, দরপতনের কারণে নূরুজ্জামানের একটি হিসাবে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র ৪৮ হাজার টাকায়। অপর একটি হিসাবে ২৪ লাখ ২২ হাজার টাকা এসে ঠেকেছে নয় লাখ টাকায়। এর কয়েক দিন আগে হাবিবুর রহমান নামে আরেকজন বিনিয়োগকারী রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। এক হিসাবেই তাঁকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে। 
ঝুঁকির মধ্যে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো: শেয়ারের বিপরীতে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ জোগান দিয়ে থাকে, টানা দরপতনে সেসব প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এসব ব্রোকারেজ হাউসের অনেক গ্রাহকের নিজের মূলধনের অংশ হারানোর পরও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকায় টান পড়েছে। বেসরকারি ব্যাংক পরিচালিত একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অনেক গ্রাহকের বিনিয়োগ কোষ বা পোর্টফোলির অবস্থা এমন হয়েছে যে এখন বিক্রি করলে ব্রোকারেজ হাউসের নিজের টাকা চলে যাবে দুই কোটির মতো। এ অবস্থায় তাঁদের মুনাফার একটি অংশ থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাড়াতে হচ্ছে। আবার যেসব গ্রাহক এ মুহূর্তে ঋণ পেলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন, একক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার) বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সীমার কারণে তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।
বন্ধ হওয়ার পথে ব্রোকারেজ হাউসের শাখা: ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে দেশের ২৮টির মতো জেলায় শেয়ারবাজারের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৮ সালে সারা দেশে ডিএসইর আওতাধীন শাখা ছিল যেখানে ২৭২টি, সেখানে ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। বর্তমানে এসব শাখায় তিন হাজার ২০০টি ওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে লেনদেন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে সিএসইসির ১৩৭টি ব্রোকারেজ হাউসের ১৬০টির মতো শাখা রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ক স্টেশনের জন্য একজন করে অনুমোদিত প্রতিনিধি (অথরাইজ রিপ্রেজেনটেটিভ) কাজ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিটি শাখায় গড়ে ৮ থেকে ১০ জন্য লোক কাজ করেন। বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ায় এ রকম অনেক শাখায় কার্যক্রম সীমিত হয়ে এসেছে। কোনো কোনো দিনে একবারও লেনদেন হয় না বলে জানা গেছে।
এ রকম একটি শাখা ব্যবস্থাপক প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে তাঁর হাউসে ১০ লাখ টাকার শেয়ারও লেনদেন হয়নি। এ লেনদেন থেকে যে সামান্য কমিশন আয় হয়, তা দিয়ে কার্যালয়ের ভাড়া মেটানোও কঠিন।

রবিবার, ২২ মে, ২০১১

কারও কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিনি



সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ঝড়ের কাছে তার ঠিকানা রেখে বিচারক জীবন থেকে বিদায় নিলেন। ১৯, হেয়ার রোডের সুবিশাল, সুসজ্জিত পটে আঁকা ছবির মতো প্রধান বিচারপতির বাড়ি_ যে বাড়িতে তিনি ৭ মাস বসবাস করেছেন, সাড়া জাগানো, দেশ কাঁপানো রায় লিখেছেন সেই বাড়ি ছেড়ে ঢাকা কলেজের গা-ঘেঁষে একটু পশ্চিমে গিয়ে কানা গলির প্রায় শেষ প্রান্তে ৩, নায়েম রোডের পাঁচ তলা ভবনের নিচতলায় নিজের ফ্ল্যাটে উঠলেন গত মঙ্গলবার। ধূলিধূসর, অগোছালো শত শত পুস্তক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রায় প্রতিটি কক্ষে। ড্রইং রুমে ঠাসাঠাসি করে রাখা অতি সাধারণ সোফায় বসে আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা কথা বললেন এবিএম খায়রুল হক। পরনে প্রিয় সফেদ পাঞ্জাবি। দেখেই বুঝতে পারি, ক্লান্তি তাকে ক্ষমা করেনি। চোখে-মুখে, অবয়বে ক্লান্তি তার নাম লিখলেও সুদীর্ঘ সময় তিনি অক্লান্তে কথা বললেন সমকালের সঙ্গে।
বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পরিব্যাপ্ত এই আলাপচারিতার সময় উপস্থিত ছিলেন সমকালের আইনবিষয়ক প্রতিবেদক ওয়াকিল আহমেদ হিরন। আইনের গভীর জটিল এবং খানিকটা দুর্জ্ঞেয় বিষয়, রাজনীতি, জীবন সংগ্রামের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা, ভালোলাগা-মন্দলাগার নানা প্রসঙ্গের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত এমনকি টিভি চ্যানেলের মধ্যরাতের টকশোও আলোচ্য বিষয় থেকে বাদ যায়নি। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি 'বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ২০ বিচারপতি'র অন্যতম বলে প্রশংসিত হয়েছেন,
তেমনি কারও কারও কাছে 'ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত' বিচারপতি হিসেবে ধিক্কৃতও হয়েছেন।
সমকালের প্রশ্নের জবাবে এবিএম খায়রুল হক বলেছেন, সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে, আপন বিবেকের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে, সংবিধান ও আইনকে সমুন্নত রেখে ন্যায়বিচার ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংশ্লিষ্ট একাধিক রায় প্রদান করেছি। কারও কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিনি। আমি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করিনি, সাহসিকতার পথ থেকে বিচ্যুত হইনি। এ প্রসঙ্গে তিনি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের একাধিক ব্রিটিশ বিচারপতির সাহসিকতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এই দলের অনুসারী আইনজীবীরা বিদায়ী প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নেও বিতর্কিত রায় দিয়ে দেশে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টির জোরালো অভিযোগ তুলছেন। সেই সঙ্গে তাকে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে মেনে না নেওয়ার আগাম ঘোষণাও দিয়েছেন।
বিচারকের দায়বদ্ধতা
সমকালের মন্তব্য : অনেক বিচারক মনে করেন তাদের দায়বদ্ধতা অন্য কারও কাছে নয়, শুধু বিবেকের কাছে। এবিএম খায়রুল হকের জবাব : বিচারক প্রথমত নিজের বিবেকের কাছেই দায়বদ্ধ। কারণ এই বিবেকই তাকে সঠিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে উজ্জীবিত করে, উৎসাহিত করে। এই বিবেক তার ন্যায়বোধ। তবে বিচারকদের দায়বদ্ধতা শুধু বিবেকের কাছেই_ এ কথা তিনি মনে করেন না। তার মতে, বিচারকের প্রথম দায়বদ্ধতা সৃষ্টিকর্তার কাছে, দ্বিতীয়ত বিবেকের কাছে, তৃতীয়ত জনগণের কাছে। এ প্রসঙ্গে তার ব্যাখ্যা : রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। তিনটি স্তম্ভই জনগণকে সেবা করার জন্য। তাই বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা জনগণের কাছেও।
বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন
বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সমকালের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশ বিভাগের আগে এবং এর পরও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়টি কখনও উপাদেয় বিতর্কের বিষয় হয়নি। প্রধান বিচারপতির বিবেচনার ওপর সবার আস্থা ছিল অখণ্ড। কেউ কখনও প্রশ্ন তুলতেন না। '৯০ সালের দিকে বিচারপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরীকে সম্ভবত ৫ থেকে ৭ বার সুপারসিড করা হয়েছে। বিচারপতি ডিসি ভট্টাচারিয়াকে অল্পদিনের মধ্যেই হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগে নেওয়া হয়। তিনি সে সময়ে ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ, বিশাল আইনজ্ঞ। তার নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। এবিএম খায়রুল হক বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি ১০-১২ জন বিচারপতিকে স্থায়ী করার জন্য সুপারিশ করার আগে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের সিনিয়র বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সুপারিশ পাঠান। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তই সঠিক। খায়রুল হক বলেন, এসব ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিকে 'নো' বলতে হবে। প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের বাইরে ভারত ও পাকিস্তানে কোনো বিচারপতি নিয়োগ হয় না।
আপন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে ৭ মাস দায়িত্ব পালনকালে অমুককে বিচারপতি বানান, তমুকের সার্ভিস রেকর্ড ভালো, আইনজীবী ভালো বলে কত না সুপারিশ পেয়েছি। তদবিরকারীদের তালিকায় নামকরা সম্পাদকও রয়েছেন, আমি কারও সুপারিশ শুনিনি।
বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট
বিচারপতিদের ইমপিচমেন্ট ক্ষমতা কার কাছে থাকা উচিত, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল, না সংসদ_ এই মর্মে এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি বললেন, এক সময় আমাদের সংবিধানে ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ছিল। পরে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত হয়। এখন এই ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। ইতিমধ্যে আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, আমি নাকি এই ক্ষমতা সংসদকে দেওয়ার পক্ষে। সংসদকে এই ক্ষমতা দেওয়া, না দেওয়া সম্পর্কে আমি কিছু বলিনি। আমি উচিত-অনুচিতের বিষয়টি সংসদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। সাবেক প্রধান বিচারপতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাজা-রানীর রোষানল থেকে বিচারপতিদের রক্ষার জন্য ১৬৮৮ সালে ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা হাউস অব কমন্সে নিয়ে যাওয়া হলো। এর আগে রাজা-রানীর ইচ্ছামতো বিচারকদের নিগৃহীত করা হতো, কারাদণ্ড দেওয়া হতো। এবিএম খায়রুল হক বলেন, বিচারপতিদের ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকবে, না সংসদের কাছে প্রত্যর্পণ করা হবে তা গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও এ ক্ষমতা সংসদের হাতে গেলে কিছুটা সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। তিনি বলেন, ইমপিচমেন্টের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোট প্রয়োজন হবে। সব নির্বাচনে একটি দলের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমাদের দেশের বাস্তবতায় সরকার ও বিরোধী দল কোনো বিষয়ে একমত হতে পারে না, সে ক্ষেত্রে ইমপিচমেন্ট কীভাবে হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সাংসদদের স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা দেওয়া না হলে সংসদের ইমপিচমেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগ সহজ নাও হতে পারে। বিষয়টি গভীর সতর্কতার সঙ্গে ভেবে দেখতে হবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এবিএম খায়রুল হক মনে করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আক্ষরিকভাবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তার দৃষ্টিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানেই বিচারকের আপন মননশীলতার আলোকে মানসিক স্বাধীনতা। স্বাধীন বিচার বিভাগের এটিই হচ্ছে বড় রক্ষাকবচ। তিনি বলেন, দেশ বিভাগের আগেও বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। দেশে ইনস্টিটিউশনগুলো ছিল পরাধীন। তখন কেউই বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করার সাহস পেত না। তখন এবং স্বাধীনতার পরও বিচারকরা ছিলেন অনেকটা নিভৃতচারী। তারা নিজেদের গুটিয়ে রাখতেন_ সবার প্রভাববলয়ের বাইরে থাকতেন। এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। তিনি বেশ উচ্চকণ্ঠেই বললেন, আমাকে কেউ কোনোদিন প্রভাবিত করা তো দূরের কথা, আকারে-ইঙ্গিতেও কিছু বলার সাহস পায়নি।
সাংবিধানিক পদে নিয়োগ
বিচারপতিসহ সব সাংবিধানিক পদের নিয়োগ সংসদে অনুমোদনের সাম্প্রতিক দাবির প্রসঙ্গ তোলা হলে এই সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেন, তা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি আমেরিকার দৃষ্টান্তকে বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য বলে মনে করেন না। আমাদের দেশে সিনেট নেই। বিচারপতি পদে নিয়োগ অনুমোদনের জন্য সাংসদদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে তা আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক মনে হতে পারে। এ দেশে একজন চাপরাসি নিয়োগের সময় মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ আসে এন্তার। সে ক্ষেত্রে একজন জুডিসিয়াল জজ ও একজন প্র্যাকটিসিং অ্যাডভোকেটকে সংসদের সামনে ঠেলে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নাও হতে পারে। এই প্রস্তাব 'আইডিয়াল', 'প্রাকটিক্যাল' নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
সাবেক প্রধান বিচারপতি মনে করেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং জনমানুষের প্রত্যাশা পরিপূরণ ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্য গণমাধ্যমের শর্তহীন স্বাধীনতা আবশ্যক। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিকাশ আন্তর্জাতিক মানের বলে তিনি বিশ্বাস করেন। প্রশংসার পাশাপাশি তিনি মিডিয়ার সমালোচনাও করেন। তিনি বলেন, এখন সাংবাদিকরা যেন বিষয়ের গভীরে যেতে আগ্রহী নন। অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ভাসা ভাসা, যেন উড়ন্ত পাখির চোখে সব কিছু দেখা। অনেক প্রতিবেদন পড়ে মনে হয়, সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলার পরিশ্রম পরিহার করে একটি অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অনেকে পড়াশোনা করতে চান না। বিচার বিভাগ, বিচারালয়, বিচারকদের নিয়ে লিখতে গিয়ে নূ্যনতম যেটুকু জানা দরকার, অনেক সাংবাদিক তা জানেন না। ফলে রিপোর্ট হয় একপেশে, সাদামাটা। এসব রিপোর্টে পাঠকের আগ্রহ কম। আপনি নদীর ওপর লিখবেন_ নদী সম্পর্কে জানুন। নদী সংক্রান্ত মামলার রায় দিতে গিয়ে আমাকেও যৎকিঞ্চিৎ পড়াশোনা করতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত চেম্বার জজ সংক্রান্ত রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, যিনি এই রিপোর্ট লিখেছেন তিনি চেম্বার জজ সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। না জেনেই তিনি বিশাল এক রিপোর্ট ফেঁদে বসেছেন। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের জানা উচিত ছিল চেম্বার জজ কী অবস্থায় রায় দেন। জানতে হবে চেম্বার জজের কাছে কোনো কাগজপত্র থাকে না, তিনি দু'পক্ষের কথা শুনে অর্ডার দেন।
এবিএম খায়রুল হক মনে করেন, রায়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমালোচনায় কোনো বাধা নেই। বিশ্বজুড়ে রায়ের সমালোচনা হচ্ছে। যারা সমালোচনা করেন তারা জুডিসিয়ারি সম্পর্কে বিজ্ঞ। বিচারকদের নিয়ে সমালোচনা হয় না।
পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী হাইকোর্টের দেওয়া রায় প্রসঙ্গে খায়রুল হক বলেন, সে সময় বিএনপির সরকার ক্ষমতায় ছিল। সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, এ মামলাটি হাইকোর্টে আমাদের বেঞ্চে নিয়ে আসেন সুপ্রিম কোর্টের বারের বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদোজ্জা বাদল। দু'একদিন শুনানির পরেই আমাদের বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন হয়ে গেল। মামলাটি আর শুনানি হলো না। আবার আমাদের বেঞ্চে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হলো। তখন আবার এ মামলাটি শুনানির জন্য আনা হয়। রাজনৈতিক অসুবিধার কারণে তিনি মামলাটি শুনানি করলেন না। এরপর এলেন আবদুল ওয়াদুদ ভঁূইয়া। তিনি বললেন, আমি চিরকাল সরকারের পক্ষে মামলা করে আসছি। আমার পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা অনৈতিক হবে। এরপর মামলাটি ২০০৪ সালের শেষ দিকে কয়েকদিন শুনানি হয়। ২০০৫ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক একদিন সকাল থেকে মামলার শুনানি শুরু করলেন। কিন্তু লাঞ্চের পর তিনি এলেন না। খবর পেলাম, তার নাকি এ মামলাটি রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে। হঠাৎ একদিন মামলাটি আবার উপস্থাপন করলেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি। তিনি ভালোভাবে মামলাটি শুনানি শুরু করলেন। তখন মামলার নথি পড়ে বুঝতে পারলাম সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর (মার্শাল ল') বিষয়টি সেটাসাইড না করে মুন সিনেমা হলের মালিকের মূল মামলায় যাওয়া যাচ্ছে না। সে সময় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। আমরা দিনের পর দিন মামলা শুনেছি। কয়েকজন অ্যামিকাস কিউরিও নিয়োগ করা হয়েছিল। তিন মাস ধরে এ মামলা গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছি। শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট মামলার রায় দেওয়া হয়।
খায়রুল হক বলেন, রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল আমাদের ওপর খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন। আমি টেলিভিশনে দেখেছি। এরপর কে বা কারা আমাকে টেলিফোনে বহুবার হত্যার হুমকি দিয়েছিল। কাফনের কাপড় পাঠিয়েছিল। রায়ের পর সহকর্মীরা (বিচারপতি) পর্যন্ত আমাকে এড়িয়ে চলতেন। সে সময় তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি আমার সঙ্গে খুবই দুর্ব্যবহার করতেন। দেখা হলে বার বার একটাই প্রশ্ন_ কবে মামলায় সই করবেন। এত বড় মামলার রায় সই করা খুবই সমস্যা ছিল। খায়রুল হক বলেন, সে সময় প্রতি মুহূর্তে আমার প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল। তবে প্রতি মুহূর্তে দোয়া চাইতাম, রায়টি লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ যেন আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন। তবে সরকার সরাসরি আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি।
ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়
ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলার রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পাশাপাশি আগামী দুটি নির্বাচন এ পদ্ধতিতে করা যেতে পারে বলে যে মতামত দেওয়া হয়েছে তাকে বিরোধী দল 'সাংঘর্ষিক' বলেছে। এ প্রসঙ্গে খায়রুল হক বলেন, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ও জনগণের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এই রায় দেওয়া হয়েছে। এটি মোটেই সাংঘর্ষিক নয়।
এবিএম খায়রুল হক বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী, ফতোয়া, সপ্তম সংশোধনী, পঞ্চম সংশোধনী রিভিউ ও সর্বশেষ ট্রুথ কমিশন নিয়ে রায় দেওয়ার ব্যাপারে একটি সামাজিক চাপ ছিল। বাস্তবতার নিরিখে ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় প্রয়োজন ছিল বলে আমরা বিচারপতিরা মনে করেছি। বার থেকেও বার বার বলা হচ্ছিল। পঞ্চম সংশোধনী রায় হয়ে গেল, সপ্তম সংশোধনী রায়টা নিষ্পত্তি না করে জামিন আবেদনটা নিষ্পত্তি করতে পারছিলাম না। তার মানে জামিন আবেদনটা ডিসাইড করতে গেলে আমাদের সপ্তম সংশোধনীর লিগ্যালিটি সম্পর্কে ডিসাইড করতে হয়। আমাদের হাতে সময়ও ছিল না। তাছাড়া পার্ট হার্ড (আংশিক শুনানি) তিন মামলা ছিল। যেমন যমুনা গ্রুপের মামলা। আরও ২টি মামলা ছিল। আমরা এসব মামলা আংশিক শুনানি হিসেবে রেখেছিলাম। মাঝে অন্য মামলা চলে আসার ফলে এ তিনটা মামলা আমরা ধরতে পারিনি।
এবিএম খায়রুল হক বলেন, আমি সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বিচারকদের হাত-পা বাঁধার কথা বলেছিলাম। সেদিন আমরা সবাই এক হয়েছিলাম ৩০ তলা ও ৭ তলা ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর করার উদ্যোগ নিয়ে। এ ব্যাপারে আমার সিনিয়র বন্ধু ও বড় ভাই ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের অনেক অবদান রয়েছে। তার সরাসরি ভূমিকা ছাড়া দুটি প্রজেক্টের একটিও করা সম্ভব হতো না। যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন দেখে হয়তো তার খারাপ লেগেছিল। সে কারণেই তিনি হয়তো বিচারকদের সম্বন্ধে রূঢ় ভাষায় কথা বলেছিলেন। ৯০ ভাগ বিচারক সৎ, কর্মক্ষম ও পরিশ্রমী। তারা পরিশ্রম না করলে বিচার ব্যবস্থা এখনও যেভাবে রয়েছে তাও থাকত না। তবে মানুষের যে বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে তা প্রমাণ করে ক্রমাগত মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আছে। আমাদের বিচারকদের যে অসুবিধা আছে সেটাও তাদের দেখতে হবে। যারা এর সমালোচনা করেছেন তারাও ভালো করে জানেন, আমি কী বুঝিয়েছি। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে যা ছিল তা পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। ফিরিয়ে দিলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সুবিধা হবে। এই অনুচ্ছেদে বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির বিষয়গুলো রয়েছে। আইনমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন, তা আংশিক সত্য। তবে বিচারকরাই সব সময় কাজ করে থাকেন। এখন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন মাত্র কনসাল্টেশন করে থাকে। ১১৬ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে দেওয়া হলে আমরা পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন হতে পারব। এই হাত-পা বাঁধার সঙ্গে বিচারিক কাজের কোনো সম্পর্ক নেই।
আদালত অবমাননা
আদালত অবমাননা খুবই সংবেদনশীল প্রশ্ন বলে মনে করেন এবিএম খায়রুল হক। আদালত অবমাননা মামলায় অভিযুক্তকে এজলাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করানোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা মোটেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই বছর তিনি আদালত অবমাননা সংক্রান্ত মামলার বিচার করতেন। প্রায়ই আদালতে সচিব, সাংবাদিক, জেলা প্রশাসকের মতো বিশিষ্টজনরা উপস্থিত হতেন। কোনো দিন কাউকে তিনি ৩০ সেকেন্ডের জন্যও দাঁড় করিয়ে রাখতেন না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তাকে দারুণভাবে পীড়িত করেছে। এ পর্যায়ে সমকাল বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদকে অশালীন ভাষায় তিরস্কারের প্রসঙ্গ তুললে সাবেক প্রধান বিচারপতি ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন।
আদালতে দুর্নীতি
বিচারপতি থাকাকালে আদালতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষের ডালপালা মেলায় দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খায়রুল হক। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে দুর্নীতি প্রসঙ্গ বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। নিম্ন আদালতে দুর্নীতি তো ওপেন সিক্রেট। উচ্চ আদালত? উচ্চ আদালত কি ধোয়া তুলসী পাতা? এবিএম খায়রুল হক তা মনে করেন না। উচ্চ আদালতে দুর্নীতি লক্ষ্য করে তার হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তা কেউ দেখেনি। বিচারপ্রার্থীরা এখানেও অসহায়। অনেক ঘটনা তার জানা_ প্রমাণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি নির্বিকার ছিলেন। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বললেন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তবু অনেক সময় মনে হয়েছে এই অপ্রিয় তথ্যই হয়তো সত্য। রায় পক্ষে নেওয়ার জন্য দেশের বাইরে টাকা আদান-প্রদান করা হয়। বড় একটি শিল্প গ্রুপের করপোরেট অফিসে একজন বিচারককে দেখা গেছে বলে অভিযোগ শুনেছি। এক অর্ডারে ১১শ' লোককে জামিন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একজন বিচারকের সন্তান জামিন অযোগ্য ধারায় জেলে। তাকে বিধিভঙ্গ করে হাইকোর্ট থেকে জামিন দেওয়ার জন্য কোনো কোনো বিচারকের সুপারিশ আমাকে অগ্রাহ্য করতে হয়েছে। টাকা দিয়ে সিরিয়াল ভঙ্গ করার পেছনে শুধু বেঞ্চ অফিসারের ভূমিকা রয়েছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। পেপার বুক তড়িঘড়ি তৈরিতেও টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। বিচারকদের বেঞ্চ পরিবর্তন করা হয় নানা কারণে। এর মধ্যে দুর্নীতিও রয়েছে। আমি এসবের সংশোধন চেয়েছি। বিচারালয়ে নৈতিকতাবোধ পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছি। এ ক্ষেত্রে আমার ব্যর্থতা অবশ্যই রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ সংশোধনী, ফতোয়ার বৈধতা সংক্রান্ত অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মামলার রায় দিয়েছেন এবিএম খায়রুল হক। অন্য কোনো বিচারপতি এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিয়েছেন বলে জানা যায় না। তার রায় প্রশংসার পাশাপাশি তীক্ষষ্টভাবে সমালোচিত হয়েছে। সে সমালোচনার ভাষা ভব্যতার সীমা অতিক্রম করেছে। এ কারণে দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক পর্যন্ত আইনজীবীদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এসব রায় লেখার প্রস্তুতিপর্ব নিয়েও সাবেক প্রধান বিচারপতি সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তার ভাষায় : সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ রায় লিখেছি আমি রাতের বেলা। দরজা-জানালা খুলে দিয়েছি। হিমেল হাওয়ার মায়াবি পরশে সি্নগ্ধ হয়েছে আমার কক্ষ। নিচু লয়ে প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত বেজে চলেছে। সঙ্গীতের ইন্দ্রজালে আবিষ্ট হয়ে সবকিছু ভুলে একাগ্র মনে রায় লিখেছি। রবীন্দ্রসঙ্গীতই প্রিয় গান সাবেক প্রধান বিচারপতির। পুরনো দিনের গান হৃদয়কে আলোড়িত করে। পশ্চিমা সঙ্গীত বিশেষ করে নাইন সিম্ফনি তার প্রিয়। প্রিয় বিচারক এডওয়ার্ড কুক ও বিচারপতি মোরশেদ। প্রিয় রঙ সাদা। সময় পেলেই মধ্যরাতে টক শো দেখেন। ভালোমন্দে মিশেল সে অভিজ্ঞতা। মাঝে মধ্যে আইনের অপব্যাখ্যা শুনে কষ্ট পান। শুনে অনেকটা অবাক হলাম একটি বাংলা চ্যানেলে আশাপূর্ণা দেবীর গল্প অবলম্বনে 'সুবর্ণলতা' সিরিয়ালটি খুব কমই 'মিস' করেন। তার ভাষায়, উনিশ শতকের একান্নবর্তী বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের অবিকৃত দিনলিপি হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। অবসর জীবনে বিচিত্র বিচারক জীবন নিয়ে লেখালেখির কথাও ভাবছেন তিনি।
ছোট্ট পরিবার। মা, স্ত্রী, তিন সন্তান। মা খুরশিদ জাহান বেগম। বয়স ৮৫-র কাছাকাছি। এখনও স্নেহ-শাসনে মায়ের প্রভাব তার ওপর অপরিসীম। তিনি বললেন, ওর বাবা ছিলেন আইনজীবী। তিনি চেয়েছিলেন খায়রুল বিচারক হোক। তিনি নেই। তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। স্ত্রী আসমা হক। একেবারেই সাদাসিধা। ৪০ বছরের দাম্পত্য জীবন। এত বড় স্বামী তার_ এ নিয়ে অহঙ্কার নয়, বিনয় লক্ষ্য করেছি তার কথায়। সবকিছুতে স্বামীকে প্রেরণা জুগিয়েছেন। সংসার সামলাচ্ছেন। সংসারে কম সময় দেন বলে তার কোনো অনুযোগ নেই। এক মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়ে লায়লা আর্জুমান্দ হক ডাক্তার। লন্ডনে স্বামী-সন্তান নিয়ে আছেন। ছোট ছেলে ওয়ালিউল হক একটি বহুজাতিক কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা। বড় ছেলে আশিকুল হক বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কিছুদিন আগে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সন্তানরা আদর্শ বাবা হিসেবে দশে দশ নম্বর দিলেন। তারা বললেন, বাবা আমাদের সৎপথে থাকতে শিখিয়েছেন। সাধারণ জীবন-যাপনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বাবার জন্য তারা গর্বিত। মা বললেন, খায়রুলের বাবা আইনজীবী ছিলেন। দারুণ কড়া ছিলেন তিনি। ছেলেকে নিজের আদর্শে বড় করে তুলেছেন।
অবসর জীবন
এবিএম খায়রুল হক কিঞ্চিৎ আক্ষেপের কথা আমাদের শোনালেন। সন্তানদের প্রাপ্য পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছেন। বাবা হয়েও আমি ওদের কাছে কৃতজ্ঞ এ জন্য যে, ওদের কোনো আক্ষেপ নেই। নজরুলের মতো করে তিনি বলতে চাইলেন, হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান। ১৯৮২ সাল খুব কষ্টে কেটেছে। অনেক দিন চাল কিনতে পারিনি। সন্তানদের জন্য দুধ কিনতে পারিনি। অনেক সহৃদয় বল্পুব্দ টাকা ধার দিতেন। বাড়ি বানাতে গিয়ে ব্যাংক ও বল্পুব্দদের কাছ থেকে অনেক টাকা ঋণ করেছি। প্রতি মাসে ৬৫ হাজার টাকা করে ঋণ শোধ করতে হয়। কথা বলতে বলতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের টেলিফোন এলো। খায়রুল হক প্রথমেই জানতে চাইলেন, পেনশনের টাকা কি সপ্তাহখানেকের মধ্যে পাওয়া যাবে! এই টাকা পেলে তিনি ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা হালকা করবেন। তার প্রিয় মানুষ লেখক হিসেবে রবীন্দ্র, গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ইংরেজি সাহিত্যিক সমারসেট মম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও তার খুব প্রিয়। চোখে চোখ রেখে খায়রুল হক বললেন, ভাবছেন প্রিয় মানুষের মধ্যে বঙ্গবল্পুব্দ নেই কেন? বঙ্গবল্পুব্দর সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। সবার ওপরে তার স্থান। অনেক নামের ভিড়ে তার নামটি উচ্চারণ করতে চাইনি। আপাতত দু'সপ্তাহ বিশ্রামে থাকতে চান সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি। তারপর অসমাপ্ত রায়গুলো লিখতে শুরু করবেন তিনি।

তিনি 'ডুমুরের ফুল'


মন্ত্রণালয়ে

মন্ত্রী বটে। অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন রিসিভ করেন না। অফিসে অনিয়মিত। বর্তমান সরকারের আড়াই বছরে আড়াই মাসও অফিসে এসেছেন কিনা সন্দেহ। এই মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে প্রায়শই ফাইল অনুমোদনের জন্য পদস্থ কর্মকর্তাদের ধরনা দিতে হয়। সে এক করুণ পরিস্থিতি। যার কারণে মন্ত্রীর অফিস ও সরকারি বাসায় ফাইলের স্তূপ জমেছে।
তিনি সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও পারতপক্ষে দলীয় কার্যালয়মুখো হন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। এ নিয়ে সহযোগী সংগঠনের নেতারা আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ওই মন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেছেন। এই মন্ত্রীর নাম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী। কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ। নির্বাচনী এলাকায় যান কালেভদ্রে। সুযোগ পেলেই লন্ডন সফরে যান। এই অবস্থায় তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয় ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে রীতিমতো 'ডুমুরের ফুল' হয়ে পড়েছেন। অনেকে মনে করেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একজন মেধাবী রাজনৈতিক নেতা। বেশ গুছিয়ে কথা বলেন তিনি। যুক্তি দিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্য খণ্ডনে পারঙ্গম। দু'চারজন নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এলজিআরডি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তারপরও কেন তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন, সন্ধ্যার পর প্রায়শই কেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকছেন_এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেও অনেকে পাননি। কেন তিনি কোনো কোনো সময় দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশ পালনেও অনীহা দেখান_ এই জিজ্ঞাসা দলের শীর্ষ নেতাদেরও। তার নিষ্ক্রিয়তার কারণে প্রায়শই দলের অন্য নেতাদের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত প্রচার করতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেয়ে হেয়ার রোডে গিয়ে
লজিআরডি মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা কঠিন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ মন্ত্রিসভার কয়েকজন সিনিয়র সদস্য বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের দেখা হয়নি। তবে মন্ত্রিসভার হাতেগোনা কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বেশ সখ্য এলজিআরডি মন্ত্রীর। মন্ত্রিসভার এই সদস্যরাও অনেকটা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতোই। তাদের সঙ্গেও নেতাকর্মীদের বেশ দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। তারাও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের মতো কাজেকর্মে অনেকটা উদাসীন। ফাইল অনুমোদনে তাদেরও রয়েছে শম্বুকগতি।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার মেধা মন্ত্রণালয় পরিচালনা কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছেন না। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির অফিসে যান না। শেষবারের মতো কবে দলের বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেছেন, তা স্মরণে আনতে পারে না অনেক নেতাকর্মী। এই অবস্থায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা চলছে।
জানা গেছে, এসব কারণে ক্ষুব্ধ দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও। এলজিআরডি মন্ত্রীর খামখেয়ালিপনার কারণে অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীও বিব্রত হন।
এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা সমকালকে জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী হওয়ার পরও মহাজোট সরকারের আড়াই বছরের মধ্যে সব মিলিয়ে আড়াই মাসও নিয়মিত অফিস করেননি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এমনকি মন্ত্রণালয়ের মাসিক বৈঠকেও তিনি প্রায়ই অনুপস্থিত থাকছেন। এ কারণে তার হেয়ার রোডের সরকারি বাসায় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অনুমোদনের জন্য নিয়ে যান সচিবসহ পদস্থ কর্মকর্তারা। তারপরও ফাইলে স্বাক্ষর করতে আগ্রহ কমই দেখান মন্ত্রী। তিনি পারতপক্ষে এক সপ্তাহের আগে কোনো ফাইলের অনুমোদন দেন না। ব্যস্ততার কথা বলে কর্মকর্তাদের অনেক সময় ফিরিয়ে দেন।
মন্ত্রীর নিয়মিত অনুপস্থিতি ও দাফতক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সঠিক নির্দেশনা না থাকায় কর্মকর্তারা অনেক সময় জরুরি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কর্মকর্তারা অনেক সময় মন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হন।
অফিসে অনিয়মিত আসার পাশাপাশি টেলিফোন যোগাযোগেও বড্ড অনাগ্রহ এলজিআরডি মন্ত্রীর। তিনি খুব কমসংখ্যক লোকেরই টেলিফোন রিসিভ করেন। তার বিরুদ্ধে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন রিসিভ না করারও প্রমাণ রয়েছে। এ নিয়ে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তারপরও পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটেনি।
তবে ই-মেইল যোগাযোগে তার আগ্রহ কম নেই। তিনি যে কারোরই ই-মেইলের জবাব দেন তাৎক্ষণিকভাবে। তাতে লাভ হচ্ছে না। দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী তার ই-মেইল ঠিকানা জানেন না।
মন্ত্রীর প্রায় নিয়মিত অনুপস্থিতি ও দিকনির্দেশনার অভাবে চলতি অর্থবছরে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আদৌ নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হবে কি-না তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।
মন্ত্রীর কোপানলে পড়ার ভয়ে মন্ত্রণালয়ের কেউই মুখ খুলতে চান না। তাদের কথা, স্থানীয় সরকার বিভাগকে শক্তিশালীকরণসহ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়কে নতুন রূপ দেওয়াটা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করে যাচ্ছেন। দফতরে মন্ত্রীর অনুপস্থিতি ও ফাইল অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা হওয়ায় স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থমকে যাচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, মন্ত্রীর মতো এপিএসও অনেক সময় পদস্থ কর্মকর্তাদের টেলিফোন রিসিভ করেন না। এই অবস্থায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়াই দাফতরিক আদেশ জারি করতে হচ্ছে। আদেশ জারির পর ফাইলে পুরনো তারিখে মন্ত্রীর স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান সরকার উপজেলা পরিষদ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বেশিরভাগ পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্থানীয় সরকারের মূল স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলছে। এসব নির্বাচনের পরও মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার কারণে আগের মতোই খুঁড়িয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এগুলো শক্তিশালী করতে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
প্রায় দু'বছর আগে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হলেও চেয়ারম্যানরা আজতক সুস্পষ্ট দায়িত্ব বুঝে পাননি। চেয়ারম্যানদের নির্ধারিত দায়িত্ব দিতে উপজেলা পরিষদ আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হলেও তা সংসদে অনুমোদন পায়নি। এটি আটকে আছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এলজিআরডি মন্ত্রীর অনুপস্থিতির কারণে আইনটি চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে না।
উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করে আইনটি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সংসদীয় কমিটি। মন্ত্রীর গড়িমসির কারণে এখন পর্যন্ত আইনটি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেনি সংসদীয় কমিটি। পৌরসভাগুলোর কাঠামো উন্নত করতে একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের জন্য ফাইল তৈরি করা হলেও তা এক মাস ধরে পড়ে আছে মন্ত্রীর বাসায়।
ঢাকা সিটি করপোরশনের নির্বাচন নিয়েও কোনো ভাবনা নেই মন্ত্রণালয়ের। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দু'ভাগে ভাগ করার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেন। এর ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন আইনের সংশোধনী চূড়ান্ত করে দু'মাস আগে মন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্ত্রীর মতামত পাওয়া যায়নি।
সরকার সাম্প্রতিক সময়ে জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য জেলা পরিষদ আইনের কিছু ধারার সংযোজন-বিয়োজন করে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করার প্রস্তাব প্রায় এক মাস আগে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়। সেই ফাইল এখনও ফেরত আসেনি।
প্রধানমন্ত্রী জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এই ব্যাপারে আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও চলছে। এমনকি সম্ভাব্য প্রশাসকদের প্রাথমিক তালিকাও তৈরি হয়েছে। এলজিআরডি মন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় সন্মত হচ্ছেন না বলে পুরো প্রক্রিয়াটি ঝুলে গেছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, যুগ্ম সচিব এবং উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছুটি অনুমোদনের দায়িত্ব মন্ত্রীর। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অনাহূত ঝামেলা ও বিভ্রান্তি সইতে হচ্ছে। মন্ত্রীকে না পাওয়ায় তারা চার মাসের মধ্যেও ছুটি পাচ্ছেন না।
এ ধরনের কর্মকর্তারা ছুটি চাওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে ফাইলে স্বাক্ষর করছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব। পরে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেই ফাইল মন্ত্রণালয়ের পিও মন্ত্রীর বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানেই আটকে থাকছে ছুটি অনুমোদনের ফাইল। এই অবস্থায় বড় ধরনের বিপাকে পড়ছেন চিকিৎসা ও সেমিনারে অংশ নেওয়ার জন্য ছুটিপ্রত্যাশী কর্মকর্তারা। এই ধরনের কর্মকর্তাদের বেলায় মন্ত্রীর পিএস অশোক মাধব রায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে ছুটির আদেশ জারি করার সম্মতি দিচ্ছেন। পরে মন্ত্রীর কাছ থেকে পুরনো তারিখে এই সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে।
তিন মাস আগে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে ছুটির আবেদন করেছিলেন নীলফামারী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান। ১০ দিনের মধ্যে সচিব এই সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেছিলেন। অথচ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফাইলটি এখনও মন্ত্রীর বাসায় পড়ে আছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদফতরে প্রকৌশলী আফাজ উদ্দিন গত এপ্রিল মাসের শুরুতে ছুটির জন্য আবেদন করেও অনুমতি পাননি।
মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবদুল মালেক একটি সেমিনারে যোগ দিতে গত ১৫ মে আমেরিকার ওয়াশিংটনে গেছেন। এ বিষয়ে ফাইলে অনুমোদন দিতে মন্ত্রী দীর্ঘসূত্রতা করায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই আদেশ জারি করা হয়েছে। অবশ্য পরে ফাইল অনুমোদন করেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
গত সপ্তাহে পৌরসভাকে টোল আদেশের নির্দেশ দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ চিঠি জারির আগ পর্যন্ত ফাইলে মন্ত্রীর স্বাক্ষর নেওয়া সম্ভব হয়নি। এক সপ্তাহ পর মন্ত্রী এই ফাইলে অনুমোদন দিয়েছেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ফাইলে স্বাক্ষর করার পর নিজ হাতে তারিখ লেখেন না। মন্ত্রীর পিএস তারিখ বসিয়ে দেন।
এ পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কোনো সভায়ই মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দেননি। ফলে অনেক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পের সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে রায়েরবাজার কবর নির্মাণ প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা মহানগরীর মিরপুর ও আফতাবনগর এলাকায় দুটি কবরস্থান নির্মাণ, রাজধানীর ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়ন, মিরপুর দারুসসালাম থেকে কচুক্ষেত রাস্তা নির্মাণ, ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সড়কে এনার্জি সেভিং বাতি স্থাপনের কাজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সরকারের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন সহায়তার বরাদ্দও ছাড় করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। বরাদ্দ ছাড়ের ফাইল মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলে সেটা মাসের পর মাস আটকে থাকছে। ফলে বরাদ্দের অনেকাংশই মন্ত্রণালয়ের হাতে থেকে যাচ্ছে। এবার ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ছাড় করা হয়েছে মাত্র তিন কোটি টাকা। এভাবেই চলছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়।