পুঁজিবাজার তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্যই। কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। এ কারণে বাজারও স্থিতিশীল হতে পারছে না। ফলে নিজ দলের সদস্যদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে।
বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি)। কিন্তু তারা প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি। পুনর্গঠনই হয়নি এসইসি। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) কেবল হাতে পেয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনটি। আর কোনো অগ্রগতি নেই। আর বাজেট প্রণয়ন নিয়ে মহা ব্যস্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিছু ব্যক্তির ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়ে রেখেছে।
বাজারের সাম্প্রতিক ধসের জন্য তদন্ত কমিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির ব্যর্থতাকেই দায়ী করে এর পুনর্গঠনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দৈনন্দিন কাজের বাইরে বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কমিশন।
পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটির যেসব সুপারিশ সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে এসইসি আনুষ্ঠানিক কোনো দিকনির্দেশনাও পায়নি। গত ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তদন্ত প্রতিবেদনের ২৫টি ও মন্ত্রণালয়ের ১১টিসহ মোট ৩৬টি সুপারিশ তিন দফায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে ১১টি অবিলম্বে, ১৭টি স্বল্প মেয়াদে এবং সাতটি মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, এসইসি পুনর্গঠনের পর স্বল্প মেয়াদ বলতে এক মাস আর মধ্য মেয়াদ বলতে চার মাস সময়কে বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস (২৫ দিন) হতে চললেও সরকার গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি। এসব সুপারিশের বড় অংশই বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসইসির ওপরই বর্তাবে। কিন্তু পুনর্গঠনের কাজ অসম্পন্ন থেকে যাওয়ায় এ ব্যাপারে তেমন কিছুই করতে পারছে না সংস্থাটি।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির সদস্য হেলাল উদ্দিন নিজামী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলেই পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। আর এটা হলেই সরকার যেসব সুপারিশ গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারব।’
হেলাল উদ্দিন বলেন, এসইসি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন না হলেও দৈনন্দিন কাজ থেমে নেই। বাজার নজরদারি ও তদারকি সঠিকভাবেই চলছে। এ ছাড়া বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজের সমন্বয় ঘটানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ আপনাদের কাছে এসেছে কি না জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, ‘এটা তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই রয়েছে। তা ছাড়া মন্ত্রণালয়ে রিকুইজিশন দিয়েও সংগ্রহ করেছি।’
এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, ১৬ মে সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ১৭ মে দুদকের চেয়ারম্যান দাপ্তরিক কাজে বিদেশে যাওয়ায় এ বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি এখনো বিদেশে রয়েছেন। ২৯ মে থেকে তিনি নিয়মিত অফিস করবেন। এ প্রসঙ্গে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনার মো. বদিউজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে চাননি।
উল্লেখ্য, গত সোমবার অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘শেয়ারবাজারের দুর্নীতি সম্পর্কে কিছুদিন আগে আমরা প্রতিবেদন পেয়েছি, সে অনুযায়ী অপরাধ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশনে এবং কিছু পুলিশ বিভাগে নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে এসইসি পুনর্গঠনের পর কিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেয়ারবাজারের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে দুদককে তদন্ত করতে দেওয়া হয়েছে।’
এসইসির অসম্পন্ন পুনর্গঠন: এসইসি পুনর্গঠনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে শেয়ারবাজার। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আসছে না নতুন কোনো শেয়ার। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ সুযোগে একশ্রেণীর বিনিয়োগকারী বাজারে নানা নেতিবাচক গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চির ধরাচ্ছেন। ফলে প্রায় প্রতিদিনই লেনদেন কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে শেয়ারের দর। এ অব্যাহত দরপতনে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা মাঝেমধ্যেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। পুঁজি হারানোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের জন্য এসইসিতে একজন চেয়ারম্যান ও ন্যূনতম দুজন সদস্য প্রয়োজন। আর সরকার এবার চারজন সদস্য নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজনের নাম শোনা গেলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী দেশে না ফেরা পর্যন্ত নতুন কোনো সদস্য নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গুজব ও অনিশ্চয়তার বাজার: শেয়ারবাজার এখন পরিণত হয়েছে গুজবের বাজারে। আসন্ন বাজেটে শেয়ারবাজারের ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হচ্ছে, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব খোলার জন্য করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক হচ্ছে—এসব গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঢালাওভাবে সব ধরনের বিনিয়োগকারীর ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখবে এ ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিনে দরপতনের এগুলোই ছিল প্রধান কারণ। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রচারের পর এসব গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি টিআইএন বা মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হবে এমন কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া একই দিন এনবিআরও বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শেয়ারবাজারের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছুই তারা করবে না বলে জানিয়েছে। এনবিআরের এ প্রচারণায় কাজ না হলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।
গতকাল মঙ্গলবার টানা চার দিনের দরপতনের ধারা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে এসেছে শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৬৮ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৪৪। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৮০ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ২১১। সূচক বাড়ার পাশাপাশি উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের পরিমাণও সামান্য বেড়েছে। কিন্তু এ দর বৃদ্ধিও স্বস্তি ফেরাতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। তাই সকালে যখন দাম একটু বেশি বাড়তে দেখা গেছে তখন অনেকেই শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। এ কারণে দিনের শুরুতে যে গতিতে বাজার বাড়ছিল, দিন শেষে সেই গতি দেখা যায়নি।
পুঁজি হারিয়ে অসুস্থ: পুঁজি হারানোর ধকল সামলাতে না পেরে গত সোমবার লেনদেন চলাকালে নূরুজ্জামান (৫২) নামের এক বিনিয়োগকারী হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি রাজধানীর দিলকুশায় ফিনিক্স সিকিউরিটিজে লেনদেন করছিলেন। ব্রোকারেজ সূত্রে জানা যায়, আগের দিনগুলোর মতো ওই দিনও দরপতন অব্যাহত থাকলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বুকে ব্যথা অনুভবের কথা বললে তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস সূত্রে জানা গেছে, দরপতনের কারণে নূরুজ্জামানের একটি হিসাবে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র ৪৮ হাজার টাকায়। অপর একটি হিসাবে ২৪ লাখ ২২ হাজার টাকা এসে ঠেকেছে নয় লাখ টাকায়। এর কয়েক দিন আগে হাবিবুর রহমান নামে আরেকজন বিনিয়োগকারী রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। এক হিসাবেই তাঁকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে।
ঝুঁকির মধ্যে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো: শেয়ারের বিপরীতে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ জোগান দিয়ে থাকে, টানা দরপতনে সেসব প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এসব ব্রোকারেজ হাউসের অনেক গ্রাহকের নিজের মূলধনের অংশ হারানোর পরও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকায় টান পড়েছে। বেসরকারি ব্যাংক পরিচালিত একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অনেক গ্রাহকের বিনিয়োগ কোষ বা পোর্টফোলির অবস্থা এমন হয়েছে যে এখন বিক্রি করলে ব্রোকারেজ হাউসের নিজের টাকা চলে যাবে দুই কোটির মতো। এ অবস্থায় তাঁদের মুনাফার একটি অংশ থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাড়াতে হচ্ছে। আবার যেসব গ্রাহক এ মুহূর্তে ঋণ পেলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন, একক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার) বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সীমার কারণে তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।
বন্ধ হওয়ার পথে ব্রোকারেজ হাউসের শাখা: ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে দেশের ২৮টির মতো জেলায় শেয়ারবাজারের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৮ সালে সারা দেশে ডিএসইর আওতাধীন শাখা ছিল যেখানে ২৭২টি, সেখানে ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। বর্তমানে এসব শাখায় তিন হাজার ২০০টি ওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে লেনদেন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে সিএসইসির ১৩৭টি ব্রোকারেজ হাউসের ১৬০টির মতো শাখা রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ক স্টেশনের জন্য একজন করে অনুমোদিত প্রতিনিধি (অথরাইজ রিপ্রেজেনটেটিভ) কাজ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিটি শাখায় গড়ে ৮ থেকে ১০ জন্য লোক কাজ করেন। বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ায় এ রকম অনেক শাখায় কার্যক্রম সীমিত হয়ে এসেছে। কোনো কোনো দিনে একবারও লেনদেন হয় না বলে জানা গেছে।
এ রকম একটি শাখা ব্যবস্থাপক প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে তাঁর হাউসে ১০ লাখ টাকার শেয়ারও লেনদেন হয়নি। এ লেনদেন থেকে যে সামান্য কমিশন আয় হয়, তা দিয়ে কার্যালয়ের ভাড়া মেটানোও কঠিন।
বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (এসইসি)। কিন্তু তারা প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি। পুনর্গঠনই হয়নি এসইসি। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) কেবল হাতে পেয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনটি। আর কোনো অগ্রগতি নেই। আর বাজেট প্রণয়ন নিয়ে মহা ব্যস্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিছু ব্যক্তির ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়ে রেখেছে।
বাজারের সাম্প্রতিক ধসের জন্য তদন্ত কমিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির ব্যর্থতাকেই দায়ী করে এর পুনর্গঠনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দৈনন্দিন কাজের বাইরে বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কমিশন।
পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটির যেসব সুপারিশ সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে এসইসি আনুষ্ঠানিক কোনো দিকনির্দেশনাও পায়নি। গত ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তদন্ত প্রতিবেদনের ২৫টি ও মন্ত্রণালয়ের ১১টিসহ মোট ৩৬টি সুপারিশ তিন দফায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে ১১টি অবিলম্বে, ১৭টি স্বল্প মেয়াদে এবং সাতটি মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, এসইসি পুনর্গঠনের পর স্বল্প মেয়াদ বলতে এক মাস আর মধ্য মেয়াদ বলতে চার মাস সময়কে বোঝানো হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস (২৫ দিন) হতে চললেও সরকার গৃহীত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি। এসব সুপারিশের বড় অংশই বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসইসির ওপরই বর্তাবে। কিন্তু পুনর্গঠনের কাজ অসম্পন্ন থেকে যাওয়ায় এ ব্যাপারে তেমন কিছুই করতে পারছে না সংস্থাটি।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির সদস্য হেলাল উদ্দিন নিজামী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলেই পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। আর এটা হলেই সরকার যেসব সুপারিশ গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারব।’
হেলাল উদ্দিন বলেন, এসইসি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন না হলেও দৈনন্দিন কাজ থেমে নেই। বাজার নজরদারি ও তদারকি সঠিকভাবেই চলছে। এ ছাড়া বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজের সমন্বয় ঘটানোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ আপনাদের কাছে এসেছে কি না জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, ‘এটা তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই রয়েছে। তা ছাড়া মন্ত্রণালয়ে রিকুইজিশন দিয়েও সংগ্রহ করেছি।’
এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, ১৬ মে সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ১৭ মে দুদকের চেয়ারম্যান দাপ্তরিক কাজে বিদেশে যাওয়ায় এ বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি এখনো বিদেশে রয়েছেন। ২৯ মে থেকে তিনি নিয়মিত অফিস করবেন। এ প্রসঙ্গে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনার মো. বদিউজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে চাননি।
উল্লেখ্য, গত সোমবার অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘শেয়ারবাজারের দুর্নীতি সম্পর্কে কিছুদিন আগে আমরা প্রতিবেদন পেয়েছি, সে অনুযায়ী অপরাধ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশনে এবং কিছু পুলিশ বিভাগে নির্দেশনা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে এসইসি পুনর্গঠনের পর কিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেয়ারবাজারের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে দুদককে তদন্ত করতে দেওয়া হয়েছে।’
এসইসির অসম্পন্ন পুনর্গঠন: এসইসি পুনর্গঠনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে শেয়ারবাজার। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আসছে না নতুন কোনো শেয়ার। সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এ সুযোগে একশ্রেণীর বিনিয়োগকারী বাজারে নানা নেতিবাচক গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চির ধরাচ্ছেন। ফলে প্রায় প্রতিদিনই লেনদেন কমার সঙ্গে সঙ্গে কমছে শেয়ারের দর। এ অব্যাহত দরপতনে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা মাঝেমধ্যেই রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। পুঁজি হারানোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের জন্য এসইসিতে একজন চেয়ারম্যান ও ন্যূনতম দুজন সদস্য প্রয়োজন। আর সরকার এবার চারজন সদস্য নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র একজন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজনের নাম শোনা গেলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী দেশে না ফেরা পর্যন্ত নতুন কোনো সদস্য নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গুজব ও অনিশ্চয়তার বাজার: শেয়ারবাজার এখন পরিণত হয়েছে গুজবের বাজারে। আসন্ন বাজেটে শেয়ারবাজারের ব্যাপারে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হচ্ছে, বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব খোলার জন্য করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক হচ্ছে—এসব গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঢালাওভাবে সব ধরনের বিনিয়োগকারীর ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখবে এ ধরনের গুজব ছড়ানো হয়। শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিনে দরপতনের এগুলোই ছিল প্রধান কারণ। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রচারের পর এসব গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি টিআইএন বা মূলধনি মুনাফার ওপর কর বসানো হবে এমন কোনো কথা বলেননি। এ ছাড়া একই দিন এনবিআরও বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শেয়ারবাজারের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছুই তারা করবে না বলে জানিয়েছে। এনবিআরের এ প্রচারণায় কাজ না হলেও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।
গতকাল মঙ্গলবার টানা চার দিনের দরপতনের ধারা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে এসেছে শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৬৮ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৪৪। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৮০ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ২১১। সূচক বাড়ার পাশাপাশি উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের পরিমাণও সামান্য বেড়েছে। কিন্তু এ দর বৃদ্ধিও স্বস্তি ফেরাতে পারেনি বিনিয়োগকারীদের। তাই সকালে যখন দাম একটু বেশি বাড়তে দেখা গেছে তখন অনেকেই শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। এ কারণে দিনের শুরুতে যে গতিতে বাজার বাড়ছিল, দিন শেষে সেই গতি দেখা যায়নি।
পুঁজি হারিয়ে অসুস্থ: পুঁজি হারানোর ধকল সামলাতে না পেরে গত সোমবার লেনদেন চলাকালে নূরুজ্জামান (৫২) নামের এক বিনিয়োগকারী হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি রাজধানীর দিলকুশায় ফিনিক্স সিকিউরিটিজে লেনদেন করছিলেন। ব্রোকারেজ সূত্রে জানা যায়, আগের দিনগুলোর মতো ওই দিনও দরপতন অব্যাহত থাকলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি বুকে ব্যথা অনুভবের কথা বললে তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস সূত্রে জানা গেছে, দরপতনের কারণে নূরুজ্জামানের একটি হিসাবে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকার বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র ৪৮ হাজার টাকায়। অপর একটি হিসাবে ২৪ লাখ ২২ হাজার টাকা এসে ঠেকেছে নয় লাখ টাকায়। এর কয়েক দিন আগে হাবিবুর রহমান নামে আরেকজন বিনিয়োগকারী রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। এক হিসাবেই তাঁকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে।
ঝুঁকির মধ্যে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো: শেয়ারের বিপরীতে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ জোগান দিয়ে থাকে, টানা দরপতনে সেসব প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এসব ব্রোকারেজ হাউসের অনেক গ্রাহকের নিজের মূলধনের অংশ হারানোর পরও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকায় টান পড়েছে। বেসরকারি ব্যাংক পরিচালিত একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অনেক গ্রাহকের বিনিয়োগ কোষ বা পোর্টফোলির অবস্থা এমন হয়েছে যে এখন বিক্রি করলে ব্রোকারেজ হাউসের নিজের টাকা চলে যাবে দুই কোটির মতো। এ অবস্থায় তাঁদের মুনাফার একটি অংশ থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাড়াতে হচ্ছে। আবার যেসব গ্রাহক এ মুহূর্তে ঋণ পেলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন, একক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার) বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সীমার কারণে তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।
বন্ধ হওয়ার পথে ব্রোকারেজ হাউসের শাখা: ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে দেশের ২৮টির মতো জেলায় শেয়ারবাজারের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৮ সালে সারা দেশে ডিএসইর আওতাধীন শাখা ছিল যেখানে ২৭২টি, সেখানে ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। বর্তমানে এসব শাখায় তিন হাজার ২০০টি ওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে লেনদেন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে সিএসইসির ১৩৭টি ব্রোকারেজ হাউসের ১৬০টির মতো শাখা রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ক স্টেশনের জন্য একজন করে অনুমোদিত প্রতিনিধি (অথরাইজ রিপ্রেজেনটেটিভ) কাজ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিটি শাখায় গড়ে ৮ থেকে ১০ জন্য লোক কাজ করেন। বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ায় এ রকম অনেক শাখায় কার্যক্রম সীমিত হয়ে এসেছে। কোনো কোনো দিনে একবারও লেনদেন হয় না বলে জানা গেছে।
এ রকম একটি শাখা ব্যবস্থাপক প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে তাঁর হাউসে ১০ লাখ টাকার শেয়ারও লেনদেন হয়নি। এ লেনদেন থেকে যে সামান্য কমিশন আয় হয়, তা দিয়ে কার্যালয়ের ভাড়া মেটানোও কঠিন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন