বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০১১

মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ: মুহিত

‘২১ মে ভোর পাঁচটা। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়া থেকে আমি মাত্র ১০০ মিটার দূরে। চোখের সামনে দেখলাম, অক্সিজেন শেষ হয়ে একজন আইরিশ আরোহী মারা গেলেন। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। মনে আবার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে লাগলাম। চূড়ায় উঠে যখন বাংলাদেশের পতাকাটা ওড়ালাম, মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।’
গতকাল রাতে প্রথম আলোকে টেলিফোনে কথাগুলো বলছিলেন দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট বিজয়ী মোহাম্মদ আবদুল মুহিত (৪১)। ২১ মে সকাল সাড়ে সাতটায় তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি এভারেস্ট থেকে নেমে আসেন। বিকেলে এসে পৌঁছান নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। হাতে এভারেস্ট-জয়ের সনদ।
৮ এপ্রিল এভারেস্ট-জয়ের লক্ষ্যে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন মুহিত। ১৯ এপ্রিল তিনি নেপাল থেকে তিব্বতের উদ্দেশে রওনা হন। ২২ এপ্রিল বেস ক্যাম্পে পৌঁছান। ২৯ এপ্রিল অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে। এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেক বাংলাদেশি সজল। অসুস্থ হয়ে পড়ায় সজল আর এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার অভিযানে যেতে পারেননি। চূড়ান্ত অভিযানে মুহিতের দলে তিনিসহ সদস্য ছিলেন সাতজন। এর মধ্যে পাঁচজন শেরপা।
মূল অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুহিত বলেন, ‘১৮ মে সকাল ১০টায় অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্প থেকে রওনা দিয়ে বেলা সাড়ে তিনটায় আমি ক্যাম্প-১-এ পৌঁছাই। এটি সাত হাজার মিটার উঁচুতে। ১৯ মে সকাল সাড়ে আটটায় রওনা দিয়ে বিকেল চারটায় ক্যাম্প-২-এ পৌঁছাই। এটি সাত হাজার ৭০০ মিটার উঁচুতে। তখন সেখানে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল। আমি সেখানেই থেকে যাই। ২০ তারিখ ভোরে ঘুম থেকে উঠি। ভোর পাঁচটায় উঠে ক্যাম্প-৩-এর উদ্দেশে রওনা দিই। ক্যাম্প-৩-এ পৌঁছাই বেলা তিনটায়। এটি আট হাজার ৩০০ মিটার উঁচুতে। ক্যাম্প-৩-এ তাঁবু খাটিয়ে আমরা সাতজন গাদাগাদি করে বিশ্রাম নিলাম। ২০ তারিখ রাত নয়টায় আমরা এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার জন্য সর্বশেষ অভিযান শুরু করি। টানা ১০ ঘণ্টা উঠতে থাকি। ২১ মে সকাল সাতটায় আমি এভারেস্টের চূড়ায় উঠি।’
চূড়ায় ওঠার পর কেমন লাগল, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘চূড়ায় ওঠার পরপরই আমার অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়। আমার শেরপা অক্সিজেনের বোতল বদলে দেন। আমি আধা ঘণ্টা চূড়ায় ছিলাম। অর্থাৎ সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত।’
এ সময় সেখানে কী করলেন? মুহিত বলে চলেন, ‘পৃথিবীর সব সৌন্দর্য তখন দুই চোখ ভরে দেখেছি। ছবি তুলেছি। মাকালু আর চয়ি চূড়ার ছবি তুললাম। আকাশ পরিষ্কার ছিল। তবে বাতাস ছিল বেশ।’
নামার বর্ণনা: মুহিত বলেন, এভারেস্টে ওঠার সময় যতটা শক্তি থাকে, নামার সময় ততটা থাকে না। সাড়ে সাতটার দিকে নামতে শুরু করলাম। এভারেস্টের তিব্বতের অংশে পাথর দিয়ে হাঁটা কঠিন। নামার পথে আমি পাঁঁচটা মৃতদেহ দেখেছি। রাতের বেলায় এই ভয়ংকর পথ দিয়ে হেঁটেছিলাম। সরু পথ। সতর্কতার সঙ্গে আস্তে আস্তে নামছিলাম। শরীর ভেঙে আসছিল। ২১ তারিখ বেলা তিনটায় আমি ক্যাম্প-৩-এ এসে পৌঁছাই। শরীর তখন ছেড়ে দিয়েছে। সেখানে চা-পানি-কফি খেলাম।’ 
মুহিত বলেন, ‘কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ক্যাম্প-২-এর উদ্দেশে নামতে শুরু করলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ক্যাম্প-২-এ এসে পৌঁছালাম। ভেবেছিলাম, ক্যাম্প-১-এ টানা নেমে যাব। আমার সঙ্গে থাকা তিনজন নেমেও গেছে। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না। শেরপাকে বললাম, আমি আর আজ ক্যাম্প-১-এ যেতে পারব না। রাতে শেরপাসহ আমরা চারজন ক্যাম্প-২-এ থাকলাম। সকালে শুরু করতে দেরি হচ্ছিল। কারণ প্রচণ্ড বাতাস। সকাল ১০টার দিকে নামতে শুরু করলাম। দুপুর ১২টায় ক্যাম্প-১-এ পৌঁছালাম। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করলাম। দুপুর আড়াইটার দিকে রওনা করে বিকেল সাড়ে চারটায় এসে পৌঁছালাম অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে (এবিসি)। সেখানে বাকি তিনজন আমাকে অভ্যর্থনা জানাল।’
‘চার দিন পর এবিসিতে এসে আমি ভাত খেলাম মুরগির মাংস দিয়ে। এরপর স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে ইনাম ভাইকে (ইনাম আল হক) ফোন করলাম। এক মিনিট কথা হলো। এরপর আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বললাম।’ মুহিতের বর্ণনা।
মুহিত বলেন, ‘২৩ তারিখ পর্যন্ত এবিসিতে থাকলাম। ২৪ তারিখ ভোরে রওনা দিই। বিকেল চারটায় আমি বেস ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। সেখানে ভাত খাই। ২৪ তারিখ বিকেলে আমাকে এভারেস্ট-জয়ের সার্টিফিকেট (সনদ) দেওয়া হয়। এটি অন্য এক অনুভূতি।’ 
ওই দিনই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিংরিতে নেমে আসেন মুহিত। রাত শেষে ২৫ তারিখ (গতকাল) ভোরে আবার রওনা দেন। বেলা ১১টার দিকে জাংমু সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পৌনে ১২টার দিকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল চারটায় কাঠমান্ডু এসে পৌঁছান।
মুহিত বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সিমি গুরুং (৫০) নামে একজন নেপালি অভিযাত্রী ছিলেন। সিমির বাড়ি নেপালের মানাং জেলায়। এই জেলার কেউ প্রথম এভারেস্টে চড়লেন। তাঁকে সবাই অভ্যর্থনা জানালেন। জানালেন আমাদেরও। এখান থেকে গেলাম নেপাল ব্যাংকে। সেখানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সন্ধ্যায় হোটেলে উঠলাম।’
বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং ট্র্যাকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) সদস্য মুহিত জানান, তিন-চার দিন পর তিনি ঢাকায় আসবেন।
বিএমটিসির সভাপতি ইনাম আল হক গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৩ সালে চূড়ার স্বপ্ন নিয়ে আমরা ক্লাব শুরু করেছিলাম। সেই লক্ষ্য পূরণ হলো। কাজেই কতটুকু ভালো লাগছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।’
মুহিতের বাবা মনোয়ার হোসেন। মা আনোয়ারা বেগম। মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার উচ্চরক্তচাপ। এত টেনশন নিতে পারছিলাম না। যত দিন পর্যন্ত ওর খোঁজ পাচ্ছিলাম না, খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন আমার শান্তি লাগছে।’
মুহিতেরা চার বোন, তিন ভাই। মুহিতের পিঠাপিঠি ছোট বোন সাংবাদিক রাবেয়া বেবী। কেমন লাগছে জানতে চাইলে বলেন, ‘ও (মুহিত) ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত। হঠাৎ করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। অনেক স্মৃতি ওর সঙ্গে আমার। খুব ভালো লাগছে।’
গত বছরের ২৩ মে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন মুসা ইব্রাহীম। মুহিত দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে গত ২১ মে এভারেস্ট জয় করলেন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন