শুক্রবার, ২৭ মে, ২০১১

প্যারিসে কথা হলো হাসিনা-হিলারির


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইউনেসকো সদর দপ্তরে 'গার্লস অ্যান্ড ওমেনস এডুকেশন ফর এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি' শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেসকো সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি অনুষ্ঠানে বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হচ্ছে তাঁর সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক এজেন্ডা এবং সর্বাধিক কল্যাণলাভের জন্য সব মানবীয় কর্মকাণ্ডে পুরুষের সমপর্যায়ে আসা তাদের জন্য অপরিহার্য। 
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবে এবং ইউনেসকো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভাও বক্তব্য দেন।
প্যানেল আলোচনা সভায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মালির প্রধানমন্ত্রী সিজে মারিয়াম কালদামা সিদিবের নাম উল্লেখ করে বলেন, 'আপনারা শিক্ষাকে কোনো অধিকার নয়, বাস্তব রূপ দিয়েছেন।'
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, 'কেবল নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুসংহত করার পাশাপাশি সবার জন্য একটি নিরাপদ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ এক বিশ্ব গড়তে পারি।' জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রবর্তনের মাধ্যমে জেন্ডার ইস্যুতে নবযুগের সূচনা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে জেন্ডার ইস্যু ও নারীর ক্ষমতায়ন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ সহস্রাব্দ অ্যাওয়ার্ড-২০১০ প্রান্তিক শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের জন্য বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি, নারী মুক্তির জন্য শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম প্রধান বিষয়। এ জন্য আমাদের পূর্ববর্তী (১৯৯৬-২০০১) ও বর্তমান এই উভয় সরকারের আমলে আমরা নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি।'
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রযাত্রা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৫টি সংরক্ষিত আসন ও সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৯ জনসহ মোট ৬৪ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যা মোট আসনের ১৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও কৃষি, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন নারী। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, হুইপ, স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সদস্য পদেও রয়েছেন নারী।
তিনি জানান, ১৯৯৯ সালের আইনে সব সিটি করপোরেশনে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষণের বিধান করা হয়। ২০০৯ সালে স্থানীয় সরকারের দ্বিতীয় স্তরে দুটি ভাইস চেয়ারম্যান পদের মধ্যে একটি নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। এ পদে ৪৭৫ জন নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
জনপ্রশাসনে নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমার প্রথম সরকারের মেয়াদে প্রথমবারের মতো আমরা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে মহিলা বিচারপতি নিয়োগ দিই এবং বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি পদেও মহিলা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।' তাঁর সরকারের আমলে প্রথম মহিলা সচিব, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইত্যাদি নিয়োগের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে নারীরা বেসামরিক, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহী হয়েছে।
শেখ হাসিনা আরো বলেন, সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা, আইনি ও পুলিশি সহায়তাসহ ছয়টি বিভাগে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু রয়েছে।
ইউনেসকো মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ : জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা গতকাল বিকেলে ইউনেসকো সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় তাঁরা নারী ও শিশু শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকের শুরুতে ইউনেসকো মহাপরিচালক শিক্ষা ও সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নে শেখ হাসিনার সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার জন্য তাঁর প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্যারিসে ইউনেসকো সদর দপ্তরে বাংলাদেশের ভাষাশহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার গড়ে তোলার উদ্যোগের জন্য ইউনেসকোর প্রশংসা করেন।
সংবর্ধনায় যোগদান : প্যারিসে বুধবার রাতে শেখ হাসিনা তাঁর সম্মানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অপরাধীরা অবশ্যই শাস্তি পাবে ইনশাল্লাহ। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিচার প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। 
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি অনীল দাশগুপ্ত, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান মো. শরীফ, ফ্রান্স আওয়ামী লীগের নেত্রী জাহানারা সুলতানা, নার্গিস সুলতানা, শিউলি আখতার ও প্রখ্যাত মূকাভিনেতা পার্থপ্রতীম মজুমদার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন